সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে ৩ ডাকাত গ্রেফতার। পিকআপ সহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার

প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬, ০৯:০৮

বিভ্রম একটি মানসিক রোগের লক্ষণ

ডা. পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
বিভ্রম একটি মানসিক রোগের লক্ষণ

রজ্জুতে সর্পভ্রম বলে একটা কথা বহুকাল আগে থেকেই প্রচলিত। এর পাশাপাশি আরও একটা কথা আছে, বনের বাঘে খায় না তো মনের বাঘে খায়। এ ধরনের বিষয় যখন কারও মনে গেঁড়ে বসে তখন বুঝতে হয়, এগুলো আর স্বাভাবিক নেই। এগুলো রোগ হয়ে বাসা বেঁধেছে মনের ভেতর। এরকম কিছু কিছু বিষয় প্রাত্যহিক জীবনে আমাদের মোকাবেলা করতে হয়৷ মানসিক রোগের চিকিৎসকের দৃষ্টি দিয়ে দেখলে এগুলোর অনেক উপাদানই আমাদের মনোরোগের লক্ষণ। এ রকম একটা লক্ষণ হলো ডিল্যুশন বা অলীক ভ্রম-বাতুলতা। একে বিভ্রনও বলা যেতে পারে। ভ্রম-বাতুলতা বা বিভ্রম একটি অলীক স্থির বিশ্বাস যা ঐ সমাজে প্রচলিত নয় কিন্তু আক্রান্ত রোগী বা ব্যক্তি তা পোষণ করে। আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে এটা বিসংবাদ নিরূপণকারী সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা শোধনযোগ্য নয়। রোগবিজ্ঞানের ব্যাখ্যায় এটা একটা বিকারগ্রস্ত অবস্থা যা কুসংস্কার, মায়া, সামাজিক রীতি বা মিথ্যে ও অসম্পূর্ণ তথ্য কিংবা অন্য কোনো ভ্রমাত্মক বোধ হতে ভিন্ন অবস্থা। একে মানসিক রোগবিদ্যার পরিভাষায় ডিল্যুশনাল ডিজঅর্ডার বলে। ডিল্যুশন বিভিন্ন রোগবিকারগ্রস্ত অবস্থায় পরিলক্ষিত হয়। এটা দৈহিক বা মানসিক কিংবা মনোদৈহিক উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এটা সিজোফ্রেনিয়া, প্যারাফ্রেনিয়া, ম্যানিক ডিজঅর্ডার, বাই পোলার ডিজঅর্ডার এবং মানসিক বিষণ্নতা ইত্যাদি বিবিধ মনোরোগ সংশ্লিষ্ট হতে পারে।

ডিল্যুশন বা বিভ্রম কয়েক ধরনের হতে পারে। যেমন : বিজেয়্যর ডিল্যুশন বা উদ্ভট অলীক বিশ্বাস : এ ধরনের বিভ্রমগুলো একই সংস্কৃতিসম্পন্ন সমাজে আচরিত হয় না। এগুলো কোনো দৈনন্দিন জীবন যাপনের অভিজ্ঞতা লব্ধ নয়। যেমন : কোনো কোনো আক্রান্ত ব্যক্তি মনে করতে পারে তার শরীরের ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো অন্য কারও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাথে বদলে ফেলা হয়েছে যদিও দুজনের কারও দেহেই শৈল্যশাস্ত্রের কোনো দাগ খুঁজে পাওয়া যায় না।

অনুদ্ভট অলীক বিশ্বাস : এটা এমন এক অবস্থা যখন রোগী এমন কিছু বিশ্বাস করে যা সত্য না হলেও কারিগরিভাবে ঘটা সম্ভব। যেমন : কেু কেউ মনে করতে পারে তার ওপর সর্বক্ষণ পুলিশের নজরদারি চলছে। অথচ বাস্তবে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।

মর্জি মাফিক বিভ্রম : রোগী যখন অবিরত বিষণ্নতা বা ক্ষ্যাপাটে মনোভাবে থাকে তখন কিছু কিছু বিভ্রম তৈরি হয়। যেমন : কোনো কোনো রোগী মনে করতে পারে টেলিভিশনের সংবাদ পাঠক তাকে পূর্ণাঙ্গভাবে অগ্রাহ্য করছে। অথচ বাস্তবে এটা সম্ভবই নয়।

মর্জি নিরপেক্ষ বিভ্রম : এধরনের বিভ্রম রোগীর আবেগীয় অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। যেমন : কেউ কেউ মনে করে তার মাথার পেছনে একটা শিং গজিয়ে উঠছে। এটা তার সার্বক্ষণিক বিশ্বাস। সে বিষণ্ন থাকুক আর স্বাভাবিক থাকুক, সব সময় এই অলীক ধারণা সে পোষণ করে।

এছাড়াও প্যারানয়েড ডিল্যুশন বা সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত ভ্রম-বাতুলতা বলে একটা অবস্থা আছে। এ অবস্থায় রোগী সর্বদা মনে করে তাকে মেরে ফেলার জন্যে কেউ তার খাবারে প্রতিনিয়ত বিষ মেশায়। অথচ বাস্তবে তা হয় না। এ ধরনের ডিল্যুশন সিজোফ্রেনিয়াতে দেখা যায়। এ ধরনের রোগীর কথাবার্তায় সাযুজ্যহীনতা দেখা দেয়৷ এর পাশাপাশি প্যারানইয়াক ডিল্যুশনও দেখা যায় যাতে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিরা আক্রান্ত হয়ে থাকে। এটি দীর্ঘমেয়াদী মানসিক রোগ। এধরনের সমস্যা একক থিমের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

কিছু কিছু সাধারণ থিমের ওপর ভিত্তি করে ডিল্যুশন আবার বেশ কয়েক ধরনের হতে পারে। যেমন : নিয়ন্ত্রণের ভ্রম-বাতুলতা বা ডিল্যুশন অব কন্ট্রোল : আক্রান্ত ব্যক্তি মনে করে সম্পূর্ণ বাইরের কেউ একজন তার সকল চিন্তা-চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

ডিল্যুশন অব জেলাসি বা ঈর্ষার ভ্রম-বাতুলতা : কারও কারও স্বামীর ধারণা তার পত্নীর আর কোনো প্রেমিক আছে। সে কারও সাথে হেসে কথা বললেই তার মনে হয়, এই বুঝি সেই। এটাই হলে ঈর্ষার ভ্রম-বাতুলতা। অথচ এর কোনো ভিত্তি নেই।

পাপবোধের ভ্রম-বাতুলতা : কেউ কেউ ভিত্তিহীন বিষয়ে পাপবোধে আক্রান্ত হয়। এটকেই ডিল্যুশন অব গিল্ট বলে যা বাংলায় পাপবোধের ভ্রম-বাতুলতা বলে স্বীকৃত।

ডিল্যুশন অব থট ব্রডকাস্টিং বা চিন্তা চুরির বিভ্রম : কারও কারও মনে হতে পারে অন্য কেউ তার সব চিন্তা চুরি করে জেনে যায়। কিন্তু বাস্তবে তার চিন্তা তার মনেই থাকে, তা আর কেউ জানেও না।

নিপীড়ন বিভ্রম : কারও কারও বদ্ধমূল ধারণা থাকে, কর্তৃপক্ষ বিভিন্নভাবে তাকে নিপীড়ন করছে। এটা তার বিভ্রম মাত্র।

ডিল্যুশন অব রেফারেন্স বা উদ্ধৃতি বিভ্রম : আক্রান্ত ব্যক্তি দুজনকে কথা বলতে দেখলেই মনে করে তারা বুঝি তার সম্পর্কে বলছে, তার সমালোচনা করছে।

ডিল্যুশন অব গ্র্যান্ডিওজ বা নিজেকে বড় জাহির করা : আক্রান্ত ব্যক্তি মনে করে তার জন্ম হয়েছে রাজা হওয়ার জন্যে। কিংবা আজকাল অনেকেই নিজেকে ইমাম মেহেদী দাবি করে। এগুলোই ডিল্যুশন অব গ্র্যান্ডিওজ। তাদের কেউ আদতে সেই মহান ব্যক্তিত্ব নন।

নিহিলিস্টিক ডিল্যুশন বা ক্ষয়ক্ষতি বিভ্রম : কারও কারও ধারণা, তিনি আগে ভালো খেতে পারতেন, এখন আর সেরকম খেতে পারেন না। যখন এ ধারণা বদ্ধমূল হয় তখনই বিভ্রম তৈরি হয়। অথচ বাস্তবে তিনি এখন আগের চেয়েও বেশি খেতে পারেন অথবা আগে এতো খেতে পারতেন না আদৌ। কিংবা কোনো কোনো আক্রান্ত ব্যক্তি মনে করেন, তার বাম হাতে শক্তি আগে অনেক বেশি ছিলো। এখন তা কমে গেছে। আদতে তার হাতে শক্তির কোনো হেরফের হয়নি।

ভ্রম-বাতুলতাগ্রস্ত হওয়ার কারণ :

১. মানসিক রোগগ্রস্ত নিকটাত্মীয় হতে এ ধরনের অলীক বিভ্রমের বিস্তার

২. জীনগত পরম্পরা

৩. আক্রান্ত ব্যক্তির জ্ঞানীয় স্তরের দুর্বলতা

৪. জীবনের তীব্র কষাঘাত

৫. শ্রবণ ও দর্শনজনিত দুর্বলতা

৬. আর্থ-সামাজিক অস্বচ্ছলতা

৭. দুর্বল সাংস্কৃতিক চর্চা

৮. মস্তিষ্কে উচ্চমাত্রার ডোপামিন নিঃসরণ

চিকিৎসা

১. প্রফুল্ল থাকা

২. একা না থাকা, দলের মধ্যে থাকা

৩. বিশুদ্ধ ও মানসম্পন্ন বিনোদন

৪. পুষ্টিকর আহার ও স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন

৫. বিষণ্নতা বিদূরণকারী ঔষধ সেবন

৬. কগনিটিভ বিহেভিয়ারেল থেরাপি বা জ্ঞানীয় স্তরের আচরণিক চিকিৎসা

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়