শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:৪৮

নদীর দেশ বরিশাল ভ্রমণ

সাদিয়া মজুমদার
নদীর দেশ বরিশাল ভ্রমণ

ভোরের হালকা কুয়াশা আর শীতের হিমেল হাওয়ায় ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল তখন সরগরম। নদীর বুকে বিশালাকার লঞ্চগুলো সারিবদ্ধভাবে দঁাড়িয়ে আছে, যেন রাতের অঁাধার চিরে দক্ষিণবঙ্গের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার অপেক্ষায়। নিবিড়, আবীর, শাফিন আর অর্পিতাÑচার বন্ধু মিলে মাসখানেক ধরে প্ল্যান করছিল এই বরিশাল ভ্রমণের। ঢাকা শহরের যান্ত্রিক কোলাহল থেকে দূরে, সবুজে ঘেরা জলজ এক রাজ্যে কিছুদিন হারিয়ে যাওয়ার এর চেয়ে সেরা সুযোগ আর হতে পারে না।

তাদের লঞ্চ ‘সুন্দরী বরিশাল’ রাত নয়টায় বুড়িগঙ্গার বুক চিরে যাত্রা শুরু করল। ডেকের ওপর বসে বন্ধুরা যখন রাতের অন্ধকার নদীতে ভেসে যাওয়া ছোট ছোট ট্রলার আর নদীর তীরের মিটমিটে আলো দেখছিল, তখনই বোঝা যাচ্ছিল দারুণ এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে তারা। সারারাত গান, আড্ডা আর নদীর ঠাণ্ডা বাতাসে ব্যাকুল হয়ে কাটানোর পর ভোরে যখন তাদের ঘুম ভাঙল, তখন লঞ্চ এসে পেঁৗছেছে বরিশাল শহরের কীর্তনখোলা নদীর ঘাটে।

বরিশালে নেমে তাদের প্রথম গন্তব্য ছিল শহরের কাছেই এক ঐতিহ্যবাহী রিসোর্ট। সকালের নাস্তা সেরে তারা তৈরি হয়ে নিল বরিশালের আসল প্রাণÑ‘ভাসমান পেয়ারা বাজার’ দেখার জন্য। সকালে তারা ট্রলার ভাড়া করে রওনা হলো ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের সীমানায় অবস্থিত ভিমরুলীর উদ্দেশ্যে।

ছোট খালের ভেতর দিয়ে যখন ট্রলার এগোতে লাগল, চারপাশের দৃশ্য দেখে চার বন্ধুই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। খালের দুই পাশে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত পেয়ারা বাগান। ডালে ডালে ঝুলছে কঁাচা-পাকা তাজা পেয়ারা। আর খালের পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে শয়ে শয়ে ছোট ছোট নৌকা। স্থানীয় চাষীরা নিজ নিজ বাগানের পেয়ারা নৌকায় তুলে নিয়ে এসেছেন বিক্রির জন্য। পুরো খাল যেন পেয়ারার এক বিশাল মেলা! এক নৌকা থেকে অন্য নৌকায় পেয়ারা বেচাকেনার এই দৃশ্য পৃথিবীর আর কোথাও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। নিবিড় আর আবীর ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, আর অর্পিতা নৌকার গা ঘেঁষে যাওয়া এক বৃদ্ধ চাষীর কাছ থেকে একদম গাছপাকা মিষ্টি পেয়ারা কিনে মুখে পুরে দিল।

ভিমরুলীর ভাসমান বাজার ঘুরে তারা চলল আটঘর কুড়িয়ানা অঞ্চলের দিকে। সেখানে পেয়ারা বাগানের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাওয়া আর ছোট ছোট সঁাকো পার হওয়ার রোমাঞ্চ ছিল অন্যরকম। দুপুরের দিকে গ্রামের এক স্থানীয় বাড়িতে দেশি কায়দায় হঁাসের মাংস, কচি ডাবের পানি আর নদীর তাজা রুই মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের চিরকাল মনে রাখার মতো।

বরিশালের সৌন্দর্য শুধু পেয়ারা বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। দ্বিতীয় দিন তারা রওনা হলো উজিরপুরের ‘গুটিয়া মসজিদ’ এবং ‘দুর্গাসাগর দীঘি’ দেখতে। গুটিয়া মসজিদের চমৎকার স্থাপত্যশৈলী, বিশাল মিনার আর চারপাশের সুন্দর বাগান দেখে মন জুড়িয়ে গেল। সেখান থেকে কিছু দূরেই অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী দুর্গাসাগর দীঘি। বিশাল এই দীঘির পাড়ে বসে আড্ডা দেওয়া আর পাখির কিচিরমিচির শোনা যেন এক ঐশ্বরিক শান্তি এনে দিয়েছিল।

তৃতীয় দিন সকালে তারা পা বাড়াল বরিশালের রূপসী রূপের আরেক অধ্যায়Ñশাপলা গ্রাম বা উজিরপুরের ‘সাতলা’ গ্রামের দিকে। ভোর না হতেই তারা নৌকায় উঠে পড়ল। সূর্যের আলো ফুটতেই তাদের চোখের সামনে ফুটে উঠল এক অলৌকিক দৃশ্য। মাইলের পর মাইল লাল শাপলায় ছেয়ে আছে পুরো বিল! মনে হচ্ছিল কেউ যেন লাল গালিচা বিছিয়ে রেখেছে পানির ওপর। ভোরের হালকা রোদে লাল শাপলাগুলোর পাপড়ি খোলার দৃশ্য দেখে শাফিন বলেই ফেলল, “জীবনানন্দ দাশ যে কেন বরিশালকে এত ভালোবাসতেন এবং বারবার এই রূপসী বাংলায় ফিরে আসতে চেয়েছেন, তা আজ হাড়অস্থিতে টের পাচ্ছি।”

বরিশালের মানুষগুলোর অতিথেয়তা, সহজ-সরল জীবনযাত্রা আর আঞ্চলিক ভাষার মিষ্টি টোন চার বন্ধুর মন কেড়ে নিয়েছিল। নদীর পাড়ে বসে সন্ধ্যায় গরম গরম খাসির শিক কাবাব আর ঐতিহ্যবাহী ‘নাসিরবাদের মিষ্টি’ খাওয়ার আনন্দটাই ছিল আলাদা।

চারদিনের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু জাদুকরী সফর শেষে যখন তারা আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে ফেরার লঞ্চে উঠল, তখন সবার চোখেই ছিল একধরনের বিষাদ। বরিশাল শুধু তাদের একটি ভ্রমণ স্থান ছিল না, এটি ছিল প্রকৃতি আর জীবনের এক অপরূপ মেলবন্ধন। কীর্তনখোলার জল, ভাসমান বাজারের কোলাহল, সাতলার লাল শাপলার বিল আর পেয়ারা বাগানের সবুজ সুবাসÑসবকিছুই স্মৃতি হয়ে জমা রইল তাদের হৃদয়ের ফ্রেমে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়