প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪২
ঐতিহাসিক জ্যাপ টেপি

পৃথিবীর বুকে মানবসভ্যতার সূচনালগ্নে পৃথিবীতে মানবজাতির পাশাপাশি দেবতাদের বসবাস। অদ্ভুত এই সময়টা ফিরে আসে শতসহস্র বছর পর পর। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায়, পৃথিবীতে মানব সভ্যতার গোড়াপত্তনের এই সময়কে বলা হতো “জ্যাপ টেপি” বা প্রথম সময়। দেবতাদের সক্রিয় উপস্থিতির কারণে এই সময়টিকে পবিত্র সময়ও বলা হতো।
আজ থেকে প্রায় সাড়ে দশ হাজার বছর আগে মানবসভ্যতার অঁাতুড়ঘর, বিখ্যাত নীলনদের তীরে গড়ে ওঠা মহাপরাক্রমশালী মিশরীয় সভ্যতার গোড়াপত্তনের সময়টাকেই “জ্যাপ টেপি” বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। সে যুগের বিষদ উল্লেখ পাওয়া যায় প্রাচীন মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিতে। প্রাচীনকালে মিশরে দুটি বর্ণমালার প্রচলন ছিল । তার একটি “হায়ারোগ্লিফি” হলো মিশরীয় দেবতা এবং তাদের কাছের মানুষদের ব্যবহৃত বর্ণমালা। এই হায়ারোগ্লিফি লেখা হতো পিরামিডের গায়ে কিংবা পাথরের ফলকে খোদাই করে বিভিন্ন চিহ্ন ও আকৃতির সমন্বয়ে।
হায়ারোগ্লিফিক বর্ণনা মতে, জ্যাপ টেপি যুগে মানুষের মাঝে রক্ষাকর্তা ও শাসক হিসেবে আসমানের প্রতিনিধি দেবতারাও বসবাস করতেন। সেসকল দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত দুই দেবতা ছিলেন হোরাস এবং টর্থ। মহান হোরাস ছিলেন সে যুগের রাষ্ট্রীয় প্রধান, শাসনকর্তা, রক্ষাকর্তা এবং সামরিক প্রধান। তাকে যেভাবে চিত্রায়ন করা হয়ে থাকে হায়ারোগ্লিফিতে তা হলো, হোরাসের শরীর মানুষের মতো আর তার মাথা বাজ পাখির। বাজ পাখির মত মহাপরাক্রমশালী কিং টর্থ অতিসতর্কতার সাথে তার রাজত্বের অধীনস্থ মানুষের জীবন ও সম্পদের রক্ষা করতো।
হোরাসের পরেই সর্বোচ্চ দেবতা ছিলেন মহান টর্থ। তিনি ছিলেন জ্ঞান, ঐশ্বর্য, যাদু, শিক্ষা চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের দেবতা। তার আকৃতিকে চিত্রায়ন করা হয় মানুষের শরীরের ওপর সারস পাখির মাথা। হায়ারোগ্লিফিক বর্ণনামতে, টর্থ নিজেই ছিলেন হায়ারোগ্লিফির উদ্ভাবক এবং শিক্ষক। বলা হয়ে থাকে, টর্থ এর ছাত্ররাই পরবর্তীকালে বংশানুক্রমে টর্থের শেখানো পদ্ধতিতে পিরামিড, স্ফিংস এর মূর্তি সহ মিশরের অন্যান্য অতি আশ্চর্য স্থাপনা সমূহ নির্মাণ করেন। হায়ারোগ্লিফিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, একবার যুদ্ধে মহান দেবতা হোরাসের একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। মহান টর্থ তা চিকিৎসায় ও যাদুবিদ্যার প্রয়োগ করে দেবতা হোরাসের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনেন। মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিতে এক চোখ একটি চিহ্ন ও বর্ণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
অতি প্রাচীন সেই জ্যাপ টেপি যুগে দুই ধরনের সময়ের ধারণা প্রচলিত ছিল। একটি সময় ছিল সরলরৈখিক অপরটি চক্রাকার। সরলরৈখিক সময়ের ধারণাটি বর্তমানে আমরা সময়ের যেই ধারণাকে অনুসরণ করে থাকি তেমনই। অপর চক্রাকার সময়ের ধারণাটি হলো, জ্যাপ টেপির সময়কার মানুষেরা বিশ্বাস করত একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর পৃথিবী ও মানবসভ্যতার সবকিছু ধ্বংস হয়ে আবার পুনরায় নতুন যাত্রা শুরু করে থাকে। তখন দেবতারা পৃথিবীতে নেমে আসেন পৃথিবীকে গড়তে আর মানব জাতিকে পৃথিবীতে চলার প্রয়োজনীয় জ্ঞান শিক্ষা দিতে। দেবতা আর মানবজাতির মিলেমিশে বসবাসের সেই সময়টাকেই বলা হয়, জ্যাপ টেপির পবিত্র যুগ কিংবা প্রথম সময়।








