বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪২

ডিজিটাল আসক্তি এবং রোজার পবিত্রতা

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার
ডিজিটাল আসক্তি এবং রোজার পবিত্রতা

রমজান মাসে মুসলমানদের সংযম, আত্মশুদ্ধি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ থাকলেও ডিজিটাল মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব রোজার পবিত্রতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়ার একটি বড় সমস্যা হলো এখানে ভালো ও মন্দের মধ্যে কোনো শক্ত প্রাচীর নেই। ব্যবহারকারী চাইলেও অনেক সময় অনৈতিক, অশালীন বা অনুচিত কনটেন্ট এড়িয়ে চলতে পারে না। অ্যালগরিদমের কারণে এক ভিডিওর পর আরেক ভিডিও সামনে চলে আসে, যার সবকিছু ব্যবহারকারীর ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না-ও হতে পারে। রোজার সময় এসব দৃশ্য বা ভিডিও অনিচ্ছা সত্ত্বেও চোখের সামনে ভেসে উঠলে রোজার আত্মিক তাৎপর্য ক্ষুণ্ন হয়। ইসলাম চোখের হেফাজতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে, কারণ চোখই অন্তরে প্রবেশের অন্যতম প্রধান দরজা। রোজা মানুষকে তাকওয়ার শিক্ষা দেয়, অর্থাৎ আল্লাহভীতির চর্চা। কিন্তু যখন মোবাইল স্ক্রিনে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অহেতুক বিনোদন, অশালীন দৃশ্য কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য বারবার ভেসে ওঠে, তখন মন আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত হয়। এতে রোজার মূল উদ্দেশ্য আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি ব্যাহত হয়। অনেকেই সাহরি ও ইফতারের মধ্যবর্তী সময়ে কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া বা আত্মসমালোচনার পরিবর্তে দীর্ঘ সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটিয়ে দেন। অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং, মন্তব্য করা, বিতর্কে জড়ানো কিংবা অহেতুক ভিডিও দেখার মাধ্যমে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। এতে একদিকে যেমন ইবাদতের সুযোগ হারিয়ে যায়, অন্যদিকে মানসিক অস্থিরতা ও ক্লান্তি বৃদ্ধি পায়।

রোজা মানুষকে ধৈর্যশীল ও সংযমী হতে শেখায়, কিন্তু অতিরিক্ত ডিজিটাল ব্যবহার সেই ধৈর্যকে ক্ষয় করে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম সহজেই ভার্চুয়াল জগতের মোহে পড়ে বাস্তব জীবন ও আত্মিক দায়িত্ব ভুলে যায়। ফলে রোজা কেবল না খাওয়া-না পান করার একটি যান্ত্রিক অভ্যাসে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যার মাধ্যমে আত্মার পরিশুদ্ধি হয় না। তবে ডিজিটাল মাধ্যম সঠিকভাবে ব্যবহার করলে রোজার পবিত্রতা রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। অনলাইন কোরআন তিলাওয়াত, ইসলামি আলোচনা, তাফসির ক্লাস, দোয়া ও নসিহতমূলক ভিডিও মানুষের ইমান জাগ্রত করতে পারে। সমস্যা মূলত ব্যবহারের ধরনে। যদি মানুষ সচেতনভাবে কনটেন্ট নির্বাচন করে, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ ও নোটিফিকেশন সীমিত করে এবং নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে মোবাইল ব্যবহার বন্ধ রাখে, তবে ডিজিটাল মাধ্যম রোজার জন্য ক্ষতিকর না হয়ে বরং উপকারী হতে পারে। পরিবারের অভিভাবকদেরও এখানে বড় দায়িত্ব রয়েছে। শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা, তাদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়া এবং রোজার প্রকৃত গুরুত্ব বোঝানো। আত্মনিয়ন্ত্রণের এই চর্চা শুধু রমজানের জন্য নয়, সারা জীবনের জন্য প্রয়োজন। রোজার সময় হাদিস শোনা ও বোঝাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসের মাধ্যমে রসুল (সা.)-এর জীবনাচরণ, রোজার আদব, ধৈর্য, সহমর্মিতা ও মানবিক গুণাবলি সম্পর্কে গভীর শিক্ষা পাওয়া যায়।

বর্তমানে অসংখ্য ইসলামিক অ্যাপে সহজ ভাষায় হাদিসের অডিও ব্যাখ্যা, গল্প ও আলোচনা পাওয়া যায়। যারা পড়তে পারেন না, তারা এসব হাদিস শুনে ইসলামের সঠিক দিকনির্দেশনা লাভ করতে পারেন। এতে তাদের ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধি পায় এবং রোজার প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা সহজ হয়। ফলে রোজা শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদত না হয়ে জীবন গঠনের এক কার্যকর মাধ্যম হয়ে ওঠে। ডিজিটাল কোরআন ও হাদিস শ্রবণের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটি মানুষকে পাপ থেকে বিরত রাখতে সহায়তা করে। রোজার সময় অনেকেই অলসতা, অযথা কথা, টেলিভিশন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় নষ্ট করেন। কিন্তু যদি কেউ নিয়মিত ডিজিটাল কোরআন তেলাওয়াত ও হাদিস শোনার অভ্যাস গড়ে তোলে, তাহলে তার মন পবিত্র চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। কোরআনের আয়াত ও রসুল (সা.)-এর বাণী মানুষকে ধৈর্যশীল, সত্যবাদী ও সংযমী হতে উদ্বুদ্ধ করে। বিশেষ করে যারা পড়তে পারেন না, তাদের জন্য এই ডিজিটাল ব্যবস্থা আত্মশুদ্ধির এক সহজ ও কার্যকর পথ, যা রোজার পবিত্রতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। এই সুযোগ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে রোজা হবে আরও গভীর, অর্থবহ ও আত্মশুদ্ধিমূলক। তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, সমাজের অনেক মানুষ আছেন যারা কোরআন শরিফ শুদ্ধভাবে পড়তে পারেন না বা একেবারেই পড়তে অক্ষম। কেউ নিরক্ষর, কেউ চোখের সমস্যায় ভোগেন, আবার কেউ সময়ের অভাবে নিয়মিত কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেননি। তাদের জন্য ডিজিটাল মাধ্যম একটি উত্তম সুযোগ।

রোজার মূল উদ্দেশ্য কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা নয়, বরং আত্মাকে পবিত্র করা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে (মোবাইল অ্যাপ, ইউটিউব, ইসলামিক ওয়েবসাইট, রেডিও বা অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম) মানুষ সহজেই এই সুযোগটি নিতে পারছে। একজন রোজাদার নিজে না পড়তে পারলেও অ্যাপসের মাধ্যমে কোরআন তেলাওয়াত ও সহি হাদিসের ব্যাখ্যা শ্রবণ তাদের রোজাকে আরও পরিপক্ব ও পবিত্র করছে। যদিও আগেই বলেছি আধুনিক ডিজিটাল ডিভাইস ও সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনে যেমন আশীর্বাদ, তেমনি অসচেতন ব্যবহারে অভিশাপও হতে পারে। তবে বাস্তবতার নিরিখে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বর্জন করা সম্ভব নয়, কিন্তু এর সঠিক ও সীমিত ব্যবহারই পারে রোজার পবিত্রতা অক্ষুণ্ন রাখতে। সচেতনতা ও নৈতিক দৃঢ়তার মাধ্যমে আমরা ডিজিটাল যুগেও ইবাদতকে আমাদের চরিত্র গঠনের শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত করতে পারি, যা রোজার তাৎপর্যকে আরও মহিমান্বিত করতে পারে।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়