প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:৪৯
চাঁদপুর জেলায় শীতকালীন সবজি উৎপাদন প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন

মেঘনা, পদ্মা, মেঘনা-ধনাগোদা ও ডাকাতিয়া নদীবেষ্টিত চাঁদপুর জেলা দেশের অন্যতম কৃষিপ্রধান অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। পলিমাটি সমৃদ্ধ এই নদী অববাহিকায় রবি, আউশ, আমন ও বোরো ধানের পাশাপাশি ব্যাপক হারে শাক-সবজি উৎপাদিত হয়। চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বড়ো ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় না ঘটলে এবারও শীতকালীন সবজির বাম্পার ফলনের আশা করছে কৃষি বিভাগ।
|আরো খবর
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামার বাড়ি চাঁদপুরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি রবি মৌসুমে জেলায় মোট ৬ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ২০০ মেট্রিক টন।
ইতোমধ্যেই কৃষকরা জমি পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। জমিতে শোভা পাচ্ছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, ব্রোকলি, বেগুন, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, শিম, লালশাক, পালংশাক, গাজরসহ নানা প্রজাতির সবজি। কৃষিবিদদের মতে, জেলায় আরও অনেক পতিত জমি রয়েছে, যেখানে সরকারি প্রণোদনা পেলে চাষাবাদের পরিধি আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব।
জেলায় সবজি উৎপাদনে প্রতিটি উপজেলাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী উপজেলাভিত্তিক আবাদ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিচে তুলে ধরা হলো : চাঁদপুর সদর উপজেলায় আবাদের লক্ষ্যমাত্রা (হেক্টর) ৯৯৫, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (মে. টন) ২১,৯৯০; মতলব উত্তর উপজেলায় আবাদের লক্ষ্যমাত্রা (হেক্টর) ১,২৪৫, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (মে. টন) ২৭,৩৯০; মতলব দক্ষিণ উপজেলায় আবাদের লক্ষ্যমাত্রা (হেক্টর) ২৭৫, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (মে. টন) ৬,০৫০; হাজীগঞ্জ উপজেলায় আবাদের লক্ষ্যমাত্রা (হেক্টর) ৯০৫, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (মে. টন) ১৯,৯১০; শাহরাস্তি উপজেলায় আবাদের লক্ষ্যমাত্রা (হেক্টর) ৩৯৫, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (মে. টন) ৮,৬৯০; কচুয়া উপজেলায় আবাদের লক্ষ্যমাত্রা (হেক্টর) ৪১৮, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (মে. টন) ৯,১৯৬; ফরিদগঞ্জ উপজেলায় আবাদের লক্ষ্যমাত্রা (হেক্টর) ১,২৪৫, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (মে. টন) ২৭,৩৯০; হাইমচর উপজেলায় আবাদের লক্ষ্যমাত্রা (হেক্টর) ৬২২, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (মে. টন) ১৩,৮৮৪।চাঁদপুরের কৃষি অর্থনীতির একটি বড়ো অংশজুড়ে রয়েছে জেলার ১১টি বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল। বিশেষ করে মেঘনা অববাহিকায় জেগে ওঠা চরগুলোতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা কৃষি কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি পালনের পাশাপাশি সবজি উৎপাদনেও নারীরা দিন-রাত পরিশ্রম করছেন।
উল্লেখযোগ্য চরাঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে—মতলবের চর ইলিয়ট, চর কাসিম, সবজি কান্দি, ষষ্ঠ খণ্ড বোরোচর; চাঁদপুর সদরের রাজরাজেশ্বর, জাহাজমারা, লগ্গিমারা, বাঁশগাড়ি, চিড়ারচর, ফতেজংপুর এবং হাইমচরের ঈশানবালা, চরগাজীপুর, মনিপুর, মধ্যচর, মাঝিরবাজার, সাহেব বাজার, চরভৈরবির বাবুরচর ইত্যাদি।
এসব এলাকায় লাউ, শিম, করলা, মিষ্টি কুমড়া, কচু ও কচুর লতি, লালশাক, পালংশাক, মুলা, ঢেঁড়স, ধনিয়া পাতা ও কলমি শাক বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। জেলায় ধান, পাট, আলু ও সয়াবিনের পরেই এখন শাক-সবজির স্থান। লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা এই চাষে ঝুঁকছেন। গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে চিচিঙ্গা, করলা, ঢেঁড়স, বরবটি, পটল, কাকরল, ধুন্দুল, ডাটা ও ঝিঙা উল্লেখযোগ্য।
চাঁদপুর সদরের কুমারডুগি, মহামায়া, দেবপুর, মাস্টার বাজার ও সুন্দরদিয়া এলাকায় কৃষকরা সম্পূর্ণ বাণিজ্যিকভাবে সবজি চাষ করছেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় এবং নৌ-পথের সুবিধার কারণে এখানকার উৎপাদিত সবজি সহজেই দেশের বিভিন্ন শহর ও বন্দরে পৌঁছে যাচ্ছে।
কৃষি বিভাগের প্রযুক্তিগত সহায়তা, উন্নত বীজ, সার ও কৃষিবিদদের পরামর্শে চাষাবাদ সহজতর হয়েছে। তবে কৃষকদের জন্যে একটি বড়ো আক্ষেপের বিষয় হলো, ব্যাংক ঋণের অভাব। নদী তীরবর্তী হওয়ায় চরাঞ্চলের কৃষকদের ব্যাংকগুলো কৃষিঋণ দিতে চায় না। কৃষকদের দাবি, সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা পেলে তারা পতিত জমিগুলোকেও চাষাবাদের আওতায় আনতে পারতেন, যা জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারত।
চাঁদপুরের সবজির গুণগত মান সম্পর্কে স্থানীয় একজন কৃষিবিদ বলেন,”চরাঞ্চলের উৎপাদিত শাক-সবজি খুবই সতেজ ও তরতাজা। কৃষকরা দিনের সবজি দিনেই বাজারে বিক্রি করে দেন বলে এতে কোনো প্রকার ফরমালিন বা রাসায়নিক মেশানোর প্রয়োজন হয় না। ফলে ভোক্তারা নির্দ্বিধায় বিষমুক্ত সবজি গ্রহণ করতে পারেন।” সূত্র : রাইজিং কুমিল্লা।







