প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১১
জিপিএ-৫-এর দৌড়ে চাপা পড়ছে প্রতিভা

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থীকে বিচার করা হয় জিপিএ-৫ দিয়ে। কে কেমন ফলাফল করলো, এতেই নাকি বোঝা যায় সে সত্যিকারেই আদর্শ এবং পরিপূর্ণ একজন শিক্ষার্থী কি না! কিন্তু একজন ভালো বিতার্কিক, একজন ভালো ফুটবলার বা একজন ভালো সংগঠকও যে ভালো শিক্ষার্থী হতে পারে, এই ধারণাটি আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে পাঠ্যবইয়ের বাইরের যে বিশাল জগৎ— যাকে আমরা বলি Co-curricular Activities, তা আজও আমাদের স্কুল-কলেজে ব্রাত্য হয়ে আছে। অথচ, মানুষের সৃজনশীল বুদ্ধিমত্তা বিকাশের ও যে একটা প্রয়োজনীয়তা আছে, তা স্বীকার করার মানসিকতা খুব কম মানুষেরই আছে।
বর্তমান অবস্থা: কাগজে আছে, মাঠে নেই
খাতা-কলমে বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম বাধ্যতামূলক। জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২২-এ তো একে মূল্যায়নের অংশও করা হয়েছে। সে যাই হোক, দৈনন্দিন জীবনে না হোক মাসে কিংবা সপ্তাহে দু একদিন হলেও সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য কিছুটা জায়গা রাখা খুবই জরুরি। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
শহর বনাম গ্রাম বৈষম্য
ঢাকার নামী স্কুলগুলোতে ডিবেট ক্লাব, সায়েন্স ক্লাব, স্কাউট, বিএনসিসি বেশ সক্রিয়। দেশের জেলা পর্যায়ের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এ ব্যাপারে তেমন আগ্রহ প্রকাশ করেনা। অথচ বুদ্ধিদীপ্ত, সৃজনশীল জাতি গঠনে শুধুমাত্র একাডেমিক ফলাফলই যথেষ্ট নয়।
দেশের ৮০% শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষত মফস্বল ও গ্রামের স্কুলগুলোতে এর অস্তিত্ব শুধু দেয়ালে টাঙানো ব্যানারেই সীমাবদ্ধ।
আয়োজন সর্বস্ব সংস্কৃতি
বছরে একবার বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, একবার বিতর্ক প্রতিযোগিতা— এ দিয়েই দায় সারা হয়। সারা বছর ধরে নিয়মিত ক্লাব-ভিত্তিক চর্চা প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ, কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কেউ কেউ অনেক ভালো আঁকতে জানে,কেউবা দারুন আবৃত্তি করে, কেউ কেউ গান, গল্প কিংবা কবিতা রচনায়ও সিদ্ধহস্ত।
অভিভাবকের দৃষ্টিভঙ্গি: এখনো বেশিরভাগ অভিভাবক মনে করেন— “এসব করে সময় নষ্ট”। গান, আবৃত্তি, খেলাধুলা করলে পড়াশোনার ক্ষতি হবে, রেজাল্ট খারাপ আসবে। এই ভ্রান্ত ধারণা শিক্ষার্থীকে শুরু থেকেই পিছিয়ে দেয়। তাদের এ ধারনাই শিক্ষার্থীদের ছাই চাপা প্রতিভাকে বিকশিত হতে দেয়না।
প্রধান সমস্যাগুলো কোথায়?
শিক্ষক সংকট ও প্রশিক্ষণের অভাব: একজন গণিতের শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয় স্কাউটের, যার নিজেরই প্রশিক্ষণ নেই। সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা কোনো প্রশিক্ষিত শিক্ষক বা সম্মানী নেই। ফলে শিক্ষকদেরও আগ্রহ কম।
জাতি গড়ার করিগরদেরকে যথাযথ সম্মানী এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে সৃজনশীলতার বিকাশে উদ্যোগী করে গড়ে তুলতে না পারলে কিভাবে জাতির আগামীরা গড়ে উঠবে?
অবকাঠামো ও বাজেটের অভাব
অনেক স্কুলে একটি স্থায়ী ডিবেট ক্লাবের রুম নেই, খেলার মাঠ নেই, ইনডোর গেমস অনুশীলনের অনুকূল পরিবেশ নেই। বার্ষিক বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ হয় নামমাত্র, যা দিয়ে একটি ফুটবল কেনাও কঠিন। আর, যতটুকু বরাদ্দ হয় তা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত পৌছায় কি না তা নিয়েও রয়েছে সন্দেহ।
ফলাফল-কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা: আমাদের পুরো ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে জিপিএ-র ওপর। প্রধান শিক্ষকের মূল্যায়ন হয় পাশের হারে, শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন হয় নম্বরে। তাই প্রধান শিক্ষকও মনে করেন— ক্লাস বাদ দিয়ে বিতর্ক করলে সিলেবাস শেষ হবে না।
সৃজনশীলতা বিকাশ নিয়ে তাই তারাও মাথা ঘামান না।
সমাধানের পথ: কী করতে হবে?
এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব, তবে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।
কার্যক্রমকে রুটিনের অন্তর্ভুক্ত করা
সপ্তাহে অন্তত দুটি পিরিয়ড বাধ্যতামূলকভাবে ক্লাব ডে হিসেবে রাখতে হবে। যেমন— বৃহস্পতিবারের শেষ দুই পিরিয়ড শুধু ক্লাবের জন্য। এটি কোনো অতিরিক্ত কাজ নয়, বরং রুটিনের অংশ।এতে কিছুটা হলেও শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
শিক্ষকদের জন্য ইনসেনটিভ: যে শিক্ষকরা ক্লাব পরিচালনা করবেন, তাদের জন্য আলাদা সম্মানী, প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্কাউট, বিএনসিসি-র মতো জাতীয়ভাবে স্বীকৃত সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় করতে হবে।
অভিভাবকদের সচেতনতা: স্কুলের অভিভাবক সমাবেশে শুধু ফলাফল নয়, সহ-পাঠ্যক্রমের গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যখন জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক করে, সেটিও যে স্কুলের গর্ব— তা বোঝাতে হবে। শিক্ষার্থীরা অভিভাবক দের একটুখানি উৎসাহে দ্বিগুণ উৎসাহিত হয়ে আগামীর যথাযোগ্য নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারবে।
কম খরচে বেশি কার্যকর মডেল
সব স্কুলে বড় মাঠ সম্ভব নয়। কিন্তু প্রতিটি স্কুলে একটি দেয়াল পত্রিকা, একটি বই পড়া ক্লাব, একটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ক্লাব করা সম্ভব। এতে খরচ শূন্য, কিন্তু শেখার পরিমাণ অনেক। সকলের সমন্বিত উদ্যোগে দাবা বোর্ড, ড্রয়িং সরন্জাম সহ নানান উপকরণ ক্রয় সম্ভব। প্রয়োজন সদিচ্ছা ও সচেতনতার ছোঁয়া।
সরকার থেকে পাঠানো আইসিটি সরন্জামের যথাযথ ব্যবহার ও জরুরি। নইলে কেবল আইসিটি ডিপার্টমেন্ট থাকবে প্রতিষ্ঠানগুলোতে,কিন্তু শিক্ষার্থীরা টাইপিং এর মতো কাজটুকুও শিখতে পারবে না। অনাদরে, অবহেলায় পড়ে থাকবে ওসব সরঞ্জাম।
স্থানীয় সম্পদের যথাযথ ও পরিকল্পিত ব্যবহার: স্থানীয় পর্যায়ের সফল ব্যক্তি, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ক্রীড়াবিদদের অতিথি হিসেবে এনে কর্মশালা করানো যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা অনুপ্রাণিত হয়। শিক্ষার্থীরাও তখন স্বপ্ন দেখতে শিখবে বড়ো হওয়ার, নিজের স্বপ্নকে প্রতিভা দিয়ে রাঙানোর।
আমরা যদি শুধু জিপিএ-৫ সর্বস্ব প্রজন্ম তৈরি করি, তাহলে আমরা ভালো চাকরিজীবী পাব, কিন্তু ভালো নেতা, ভালো উদ্যোক্তা, ভালো মানুষ পাব না। একজন শিক্ষার্থীর নেতৃত্ব, সহমর্মিতা, যুক্তিবোধ, সহনশীলতাসহ সর্বোত্তম গুণ এগুলো কোনো পাঠ্যবই শেখাতে পারে না, শেখায় মাঠ, মঞ্চ আর ক্লাব।
বহির্বিশ্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো গৎবাঁধা শিক্ষায় শিক্ষিত করছেনা তাদের শিক্ষার্থীদের। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সময়োপযোগী কারিকুলাম এক্টিভিটিজ যোগ করছে তারা। আইটি সেক্টরে প্রভূত উন্নতি তারা একদিনে করেনি। নতুন প্রজন্ম কে আগামীর প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা ও চালাচ্ছে তারা। সেই জায়গায় বাংলাদেশ কেন শুধু জিপিএ নির্ভর হয়ে থাকবে? তাই সময় এসেছে, সহ-পাঠ্যক্রমকে “অতিরিক্ত” হিসেবে না দেখে, শিক্ষার “অপরিহার্য” অংশ হিসেবে দেখার। আমাদের মনে রাখতে হবে আজকের ছোট্ট ফুলেরাই আমাদের আগামীতে সুবাসিত করবে।








