মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১০

ধারাবাহিক স্মৃতিকথা

বড়বেলার স্কুলজীবন

হীরামনি
বড়বেলার স্কুলজীবন

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

মিউজিয়াম ঘোরা শেষ। এবার সয়াবিন আইসক্রিম খেতে যাওয়ার পালা। সয়াবিন আইসক্রিম পার্লারটা রাস্তার ওপারে। গেলাম ওখানে। একটা আইসক্রিম বানিয়ে আমাকে দিলো একজন সুন্দরী কোরিয়ান মধ্যবয়স্ক নারী। স্বাদ ঠিক আছে কি না জিজ্ঞেস করলেন। আমি মাথা নাড়লাম আর বললাম “মাসিসসয়ো”। মাসিসসয়ো কোরিয়ান শব্দ যার অর্থ সুস্বাদু। সত্যিই দারুণ স্বাদের আইসক্রিম, মাইনাস ১ ডিগ্রি তাপমাত্রায় আইসক্রিম খেয়ে এতো ভালো লাগবে আগে আন্দাজ করতে পারিনি। আইসক্রিম খেয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম, এবার গন্তব্য চুসন ডাইনাস্টি।

গাড়ি চলছে চুসন ডাইনাস্টির দিকে। আমি আবার অডিওবুক শোনা শুরু করলাম। আধ ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। গাড়ি থেকে নামলাম। এতো শীত! ঠাণ্ডা আমার একদম ভালো লাগে না কিন্তু আমি আবার খুব সহজে যেকোনো পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারি। শীতকেও মানিয়ে নিয়েছি। গাড়ি থেকে নেমেই প্রথম যা চোখে পড়লো, সেটা দারুণ লাগলো। গাছের কয়েকটি লম্বা টুকরো। ৩-৫ ফিট উচ্চতার হবে। এই টুকরোগুলো খুব সুন্দর করে মানুষের অবয়বে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। সেইগুলোতে আবার আকর্ষণীয় রঙ করা হয়েছে। বলা যায় কাঠের পুতুল। ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। চোখে পড়লো শত শত হ্যানক। হ্যানক হলো কোরিয়ানদের ঐতিহ্যবাহী বাড়ি। বাড়িগুলো চকচক করছে। খুব পরিষ্কার, ঝকঝকে, তকতকে। একটা বাড়ির সামনে কাশফুলের মতো কিছু ফুল দেখতে পেলাম। ইসাডোরার স্বামীকে জিজ্ঞেস করলাম এই গাছের ও ফুলের নাম কী? আমি আমার দেশের কাশফুলের কথাও বললাম। তিনি এই কাশফুল জাতীয় ফুলের নাম বললেন ‘রীড’। কোরিয়ান রীডের সাথে একটা সেলফি তুললাম। এবার চোখে পড়লো দুটো ডাস্টবিন। কী অদ্ভুত সবকিছু। আমি যেমন চাইতাম কোরিয়ার অনেক কিছু তেমন, এজন্য কোরিয়া দেশটিকে আমার ভীষণ ভালো লাগে। ডাস্টবিন দুটোয় খুব সুন্দর করে রঙ তুলিতে আঁকা। দেখে মন ভরে গেলো। বাংলাদেশে আমার বাসায় আমিও মাঝে মধ্যে এমন নকশা করি। যেমন— আমি যে ড্রামে চাল রাখি সেই ড্রামটি আমি আমার পছন্দ মতো রঙ তুলি দিয়ে এঁকে নিয়েছি। ময়লা ফেলার জন্য ঝুড়িতেও নকশা করে রেখেছি। ডাস্টবিন দুটোর ছবি তুলে সামনের দিকে এগুলাম। হ্যানক বা কোরিয়ার ছোটো ছোটো ঐতিহ্যবাহী ঘরগুলোতে কেউ কেউ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে। কোনটায় আবার মৃৎশিল্পীরা কাজ করছেন, কোনোটায় আবার কফি খাওয়ার ব্যবস্থা। আবার কিছু হ্যানক আছে সেগুলোকে হোটেল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সব কিছু খুব নিয়মমাফিক চলছে। কোনো হট্টগোল নেই। ছোটো ছোটো হ্যানকগুলো এতো সুন্দর, সুসজ্জিত, ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন বলাই বাহুল্য। একটার পর একটা হ্যানক। রাজা থাকাকালীন প্রতিটি হ্যানক ভিন্ন ভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতো। কোনোটায় রাজা থাকতেন, কোনোটায় রাণী, কোনোটায় রান্না হতো, আবার কোনোটায় লাইব্রেরি, কোনোটায় প্রার্থনা করা হতো, কোনোটায় গান বাজনা, কোনোটায় বা আবার প্রক্ষালন কাজ। ছোটো ছোটো ওয়াল দিয়ে হ্যানকগুলো আবার আলাদা করা। গেইটগুলো এতো সুন্দর, মনোহারিণী।

চুসন ডাইনাস্টিতে ছেলে মেয়েরা কোরিয়ান ঐতিহ্যবাহী পোশাক হ্যানবক পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবার মধ্যে রাজা-রাজা, রাণী-রাণী একটা ভাব। দেখে ভীষণ ভালো লাগছে। আমি আজ হ্যানবক পরিনি। কারণ আগে একবার পরেছিলাম। আজ আর পরতে ইচ্ছে করে নি, এই হ্যানবক পরে তার উপর শীতের কাপড় না পড়লে ঠাণ্ডায় হাড় জমে যাবে। হ্যানবকের উপর শীতের কাপড় পরে ঘুরাঘুরির কোনো মানে হয় না, তাই বাংলাদেশী প্রায় ২০০০ টাকায় ভাড়া করে হ্যানবক পরি নি আজ।

এক জায়গায় দেখলাম বাঁশঝাড়, একদম বাংলাদেশের বাঁশের মতো বাঁশগুলো। মনে হলো কোরিয়ান ভাষায় বাঁশকে কী বলা হয় জানা যাক। ইসাডোরার স্বামীকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন ‘দেনামু’। কোরিয়ান ভাষায় বাঁশকে দেনামু বলা হয়। বাঁশঝাড়ে ছবি তোলার জন্য লাইন লেগেছে। লাইনের তৃতীয় ব্যক্তি আমি। আমার পরে যে দুইজন দাঁড়িয়ে আছেন তাদের চেহারায় বুঝা যাচ্ছে কোরিয়ান না তারা। তাদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম ভদ্রমহিলার বাড়ি স্পেনে আর ভদ্রলোকের বাড়ি ইকুয়েডর। আমার ছবি তোলার পালা শেষ। আমি স্পেন ও ইকুয়েডরের দুইজনকে বললাম, আমার কাছে আপনাদের ফোন দেন, আমি ছবি তুলে দিই। তাদের দুইজনের একসাথে ছবি তুলে দিলাম। বিদায় নিলাম তাদের থেকে। পিছনে তাকিয়ে দেখলাম এখন তারা একে অপরের একক ছবি তুলে দিচ্ছেন। এটা দেখে আমার হাসবেন্ড পাভেলের কথা মনে পড়ে গেলো। তিনি সব সময় একটা সিঙ্গেল ছবি তুলতে চান। একবার এক জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার পর আমার বড় মেয়ে বলছিলো, “বাবার এ বছরের সেরা ডায়ালগ, একটা সিঙ্গেল।“

বাঁশঝাড় পার হলে গেলাম অন্য একটি হ্যানকে। এটা ছিলো লাইব্রেরি। এই লাইব্রেরি এখন জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত। একটা দুতলা হ্যানক। সিঁড়ি গুলো খুব খাড়া এবং সরু। দুতলার উচ্চতা কম হওয়ায় সতর্কবাণী দেয়া আছে “মাইন্ড ইয়োর হেড”। খুব সাবধানে দুতলায় উঠলাম। শীত থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য চার লেয়ারের কাপড় পরেছি, হাঁটতে তেমন স্বাচ্ছন্দবোধ হচ্ছে না, সিঁড়ি তে উঠা ত বলার অপেক্ষা রাখে না। সাবধানে সিঁড়ি পাড়ি দিয়ে দুতলায় উঠলাম। দুতলায় উঠে অবাক হলাম। একটা ছোটো খাটো জাদুঘর। জাদুঘরের মধ্যে মিনিয়েচার লাইব্রেরি, কাগজ বানানোর প্রক্রিয়ার মিনিয়েচার, বিভিন্ন সময়ের চারজন রাজার বর্ণনা দিয়ে বাঁধাই করা বই ইত্যাদি রয়েছে। ছোট্ট একটা জায়গা কিন্তু দারুণ আকর্ষণীয়।

লাইব্রেরি দেখে বের হলাম। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। এতো সুন্দর রাস্তা, বিভিন্ন নকশার পাথর দিয়ে রাস্তাগুলো করা। ছোটো বড় মাঝারি বিভিন্ন রকমের পাথর। পাথরগুলো এমনভাবে রাস্তায় বসানো হয়েছে তার মধ্যেও একটা শৈল্পিকতা বিরাজ করছে। পাথর বসিয়ে একটা বৃত্তাকার অবস্থার তৈরি করা হয়েছে একটা গোলচক্করে। কেন্দ্রে ছোটো আকারের পাথর বসানো। চারদিকে আস্তে আস্তে তুলনামূলক বড় আকৃতির পাথর বসিয়ে গোলচক্করটা তৈরি করা হয়েছে। কেমন যেন ঝিরিঝিরি একটা রাস্তা। মাথার ভিতরে একটা অসম্ভব প্রেমময় লহমা বয়ে গেলো রাস্তাটা দেখে। আমি আবার যখন তখন প্রেমে পড়ে যাই। হউক মানুষ, বা অন্য কোনো প্রাণী, বা অন্য কোনো বস্তু বা যেকোনো ধরনের সৌন্দর্যের। এবার আসলাম আরেকটি হ্যানকে। এটা রান্নাঘর। চুলার সাথে ফিক্সড করে পাতিল বসানো। পাতিলটি থেকে ঢাকনাটা সরালাম। অনেক ভারী। মনে হলো লোহার তৈরি। কাঠের টুকরা, তুষ এসব দিয়ে রান্না করা হতো চুলায়। রান্নাঘর থেকে বের হয়ে গেলাম রাজার বৈঠক ঘরে। ওটা স্পেশাল একটা হ্যানক। বেশ বড়। রাজার একটা ছবি বসানো একটি সোফায়। তার পাশে একটা স্ট্যান্ডে রাখা আছে চারটি জিনিস। দুটো দেখে মনে হলো পাখার মতো, এই পাখাগুলো দিয়ে রাজাকে হয়তো বাতাস করা হতো। অন্য দুটো দেখে মনে হলো এগুলো ছাতা। রাজাকে রোদ থেকে বাঁচানোর জন্য হয়তো এই ছাতাগুলো ব্যবহার করা হতো। তবে এই ছাতা বৃষ্টিতে ব্যবহারের উপযোগী নয়। অন্য একটা হ্যানকে ঢুকলাম। ওখানে একটা ঢেঁকি রাখা আছে। আরেকটায় ঢুকলাম, ওখানে গিয়ে দেখি একটা পালকি। সব কিছু দেখে বেশ ভালো লাগছে। গেইট থেকে বের হলাম। বের হয়েই একটি গাছ চোখে পড়লো। গাছটিকে উলের সুতা দিয়ে বোনা সোয়েটারের মতো তৈরি করে পেঁচিয়ে রাখা হয়েছে। খুব সুন্দর রঙিন সুতার বুনন দিয়ে গাছটি পেঁচানো দেখে ইসাডোরার স্বামীর কাছে এর কারণ জানতে চাইলাম। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, শীতের সময় তাই, হা হা হা। আমি আরেকটু খেয়াল করে দেখলাম রাস্তায় সারি ধরে সকল গাছের গোঁড়াই এমন সুন্দর করে পেঁচানো। আমার ধারণা সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য এই কাজ করা হয়েছে। সত্যিই ভীষণ সুন্দর লাগছে। ভীষণ সুন্দর। শুধু সুতা দিয়ে সোয়েটার বুননের ব্যাপার ত না, তাতে আবার নানা রকম এক্সেসরিসও ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন - বিভিন্ন ধরনের পাথর, মুক্তা এবং সুতা দিয়েই বানানো ফুল, পাখি, লতা, পাতা ইত্যাদি।

হীরামনি : উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বান্দরবান সদর উপজেলা, বান্দরবান।

(চলবে, পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়