মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে ৩ ডাকাত গ্রেফতার। পিকআপ সহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬, ১১:১৪

উচ্চশিক্ষার সংকটের গোড়া নিম্নশিক্ষার দুর্বল ভিতে

এম এম শহিদুল হাসান
উচ্চশিক্ষার সংকটের গোড়া নিম্নশিক্ষার দুর্বল ভিতে

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রায়ই শুনতে হয়Ñতারা নাকি দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ ও জ্ঞানসমৃদ্ধ স্নাতক তৈরি করতে পারছে না। কিন্তু এই সমালোচনামূলক আলোচনায় আমরা একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই এড়িয়ে যাইÑআমাদের প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের কতটা প্রস্তুত করে উচ্চশিক্ষার জন্য এবং একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায়?

বর্তমান কাঠামোয় উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ব্যবস্থা সেই প্রত্যাশা পূরণে অবশ্যই পিছিয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে এটি শুধু একটি সনদ নয়; গড়ে তোলে শিক্ষার্থীর চিন্তার ধরন, পড়াশোনার অভ্যাস এবং ‘মেধা’ সম্পর্কে তাদের ধারণা। ক্রমেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করছেনÑযারা পাবলিক পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করে, তাদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে হোঁচট খায়। মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতিতে অভ্যস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য সমালোচনামূলক পড়া, বিশ্লেষণধর্মী লেখা বা উন্মুক্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আলোচনায় অংশ নিতে তারা দ্বিধাগ্রস্ত হয়, ভুল করতে ভয় পায় এবং নিজস্ব অনুসন্ধানের বদলে প্রস্তুত ‘নোট’-এর ওপর নির্ভর করতে চায়।

এটি শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। বরং এটি এমন এক ব্যবস্থার স্বাভাবিক ফল, যেখানে যুক্তির চেয়ে মুখস্থ বিদ্যাকে বেশি পুরস্কৃত করা হয়। অনেক দিক থেকে বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন সেই ঘাটতির মূল্য দিচ্ছে, যার সূত্রপাত ক্যাম্পাসে পা রাখার বহু আগেই।

আমাদের প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোÑপ্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সম্ভবত এক সময় কার্যকর ছিল, যখন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য ছিল দাপ্তরিক ও নিয়মিত প্রশাসনিক জনবল তৈরি করা। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজকের বিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, জলবায়ু সংকট এবং জটিল সামাজিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে। যেসব কাজ এক সময় কেবল মানুষই করতে পারত, আজ মেশিনও তা বিশ্লেষণ, পূর্বাভাস ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে পারে।

এমন বাস্তবতায় কেবল চাপের মুখে তথ্য মুখস্থ করতে পারে, এমন প্রজন্ম নয়; বরং বিশ্লেষণ করতে পারে, পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, যোগাযোগ ও সহযোগিতা করতে পারে, এমন প্রজন্মেরই প্রয়োজন। এখন মূল প্রশ্ন আর এটি নয়, একজন শিক্ষার্থী কত তথ্য মুখস্থ করতে পারে; বরং সে জ্ঞানকে কীভাবে ব্যবহার করতে পারে। প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে সাজাতে হবে।

যদি আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভাবনী, সৃজনশীল, সমালোচনামূলক চিন্তাশীল, সহানুভূতিশীল এবং আজীবন শিক্ষায় সক্ষম স্নাতক বের হোক, তবে সেই ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই। প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সংস্কার ছাড়া উচ্চশিক্ষা সংস্কারের প্রচেষ্টা অনেকাংশেই হবে ওপরের পালিশ মাত্র।

বর্তমানে আমাদের এইচএসসি ব্যবস্থা মূলত উনিশ ও বিশ শতকের যুক্তিতে পরিচালিতÑঅতিরিক্ত মুখস্থনির্ভরতা, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষাকে মেধার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে দেখা এবং কোচিংকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, যা অর্থবহ শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার বিকল্প হয়ে উঠছে। ফলে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে পরীক্ষায় দক্ষ, কিন্তু শিক্ষায় দুর্বল অবস্থায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয়তা, জলবায়ু ঝুঁকি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় চিহ্নিত একবিংশ শতকে এটি শুধু অকার্যকর নয়; জাতীয় প্রতিযোগিতা ও সামাজিক সংহতিকেও দুর্বল করে।

প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত মৌলিক সক্ষমতা গড়ে তোলা; অগাধ তথ্যভান্ডার মুখস্থ করানো নয়। মূল শিক্ষালাভের লক্ষ্যের মধ্যে থাকতে হবে বাংলা ও ইংরেজিতে পাঠ বোঝা ও বিশ্লেষণধর্মী লেখা; সূত্র মুখস্থ নয়, গাণিতিক যুক্তি; বৈজ্ঞানিক চিন্তা অনুমান, প্রমাণ ও ভুল থেকে শেখা; ডিজিটাল ও তথ্য-সাক্ষরতা এবং নাগরিক সচেতনতার সঙ্গে নৈতিক বিচারবোধ।

বিশ্ব কোনো বিষয়ভিত্তিক সীমাবদ্ধ ধারায় চলে না। তাই পাঠ্যক্রমে আন্তঃবিষয়ক চিন্তার সুযোগ থাকতে হবে বিজ্ঞানকে সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে, প্রযুক্তিকে নীতিশাস্ত্রের সঙ্গে, অর্থনীতিকে পরিবেশের সঙ্গে এবং জ্ঞানকে দায়িত্ববোধের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একজন পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী যেন প্রশ্ন করতে পারে এটি জ্বালানি নীতি, জলবায়ু পরিবর্তন বা শিল্প খাতের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত? শিক্ষা শুধু সমীকরণ সমাধানের দক্ষতা নয়; তার প্রভাব বোঝার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।

এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে মূল্যায়ন সংস্কার। বাংলাদেশের মতো বৃহৎ জনবহুল দেশে পাবলিক পরীক্ষা সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এর প্রাধান্য কমাতে হবে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ মডেলে চূড়ান্ত পরীক্ষার পাশাপাশি কোর্সওয়ার্ক, ব্যবহারিক অনুসন্ধান, মৌখিক উপস্থাপনা, দলগত কাজ এবং শিক্ষার্থীর কাজের পোর্টফোলিও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুত হবে, যেখানে শেখা একটি দীর্ঘমেয়াদি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া একটি মাত্র উচ্চ ঝুঁকির পরীক্ষার ফল নয়।

বড় ধরনের সিলেবাস পরিবর্তন ছাড়াও প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সংস্কৃতি বদলালে শেখার ধরন বদলাতে পারে। ‘সংজ্ঞা দাও, তালিকা করো, বর্ণনা করো’ এ ধরনের প্রশ্নের পরিবর্তে তথ্য বিশ্লেষণ, কেসভিত্তিক পরিস্থিতি ও যুক্তি ব্যাখ্যার প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। একটি ভালো প্রশ্ন একই সঙ্গে ধারণাগত বোঝাপড়া, প্রয়োগ, যুক্তি ও যোগাযোগ দক্ষতা যাচাই করতে পারে।

বাংলাদেশে এইচএসসি ধীরে ধীরে এমন এক উচ্চ ঝুঁকির গলিপথে পরিণত হয়েছে, যেখানে কয়েক ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষাই প্রায় পুরোপুরি মেধার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। ফলে স্কুলগুলো পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা দেয়; কোচিং সেন্টার সম্ভাব্য প্রশ্ন অনুমান করে প্রস্তুত উত্তর সরবরাহ করে। অনেক পরিবারের কাছে শিক্ষাগত সাফল্য মানে দাঁড়ায় পরীক্ষার কৌশল আয়ত্ত করা; বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা গড়ে তোলা নয়। এর ফলে তৈরি হয় শেখার সংস্কৃতি নয়, বরং পরীক্ষায় টিকে থাকার সংস্কৃতি।

তবে সংস্কার হতে হবে বাস্তবসম্মত। বাংলাদেশের পরিসর ও বৈচিত্র্যের কথা বিবেচনায় হঠাৎ বড় পরিবর্তন প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে। তাই ধাপে ধাপে এগোনোই যুক্তিযুক্ত। প্রথম পর্যায়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ নম্বর কাঠামোবদ্ধ কোর্সওয়ার্কের জন্য বরাদ্দ করা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রশ্নের ধরন ধীরে ধীরে বিশ্লেষণ ও প্রয়োগভিত্তিক করা যেতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে আন্তঃবিষয়ক উপাদান ও তত্ত্বাবধানে প্রকল্পভিত্তিক কাজ যুক্ত করা যেতে পারে।

এশিয়ার অনেক দেশ যেমন সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ভারত উচ্চ ঝুঁকির পরীক্ষার পাশাপাশি কোর্সওয়ার্ক, স্কুলভিত্তিক মূল্যায়ন ও প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করেছে, যাতে কেবল মুখস্থ বিদ্যা নয়, গভীর বোঝাপড়া মূল্যায়িত হয়। তাদের কাঠামো ও নম্বর বণ্টন ভিন্ন হলেও মূলনীতি এক পরীক্ষা মান নিশ্চিত করবে; ধারাবাহিক মূল্যায়ন অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ ও প্রয়োগ দক্ষতা গড়ে তুলবে। বাংলাদেশকে কোনো একক মডেল অনুকরণ করতে হবে না; বরং নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় উপযোগী একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

এখন সময় এসেছে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কারকে একটি সমন্বিত জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আনার। একবিংশ শতাব্দীর প্রয়োজন অনুযায়ী জ্ঞানীয় সক্ষমতা, নৈতিক দায়িত্ববোধ ও জাতীয় আকাক্সক্ষাকে ভিত্তি করে একটি শিক্ষা কাঠামো প্রণয়নে স্বাধীন ও দূরদর্শী শিক্ষা কমিশন গঠন করা উচিত।

শিক্ষা সংস্কার কেবল একাডেমিক বিষয় নয়। এটি নির্ধারণ করে কর্মশক্তির মান, উদ্ভাবনের সামর্থ্য, সামাজিক আস্থা ও গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা। আমরা যদি পরিপক্বতার বদলে শুধু স্মৃতিশক্তিকে সনদ দিই; চিন্তার বদলে কৌশলকে মূল্যায়ন করি, তবে আমরা এমন প্রজন্ম তৈরি করব, যারা সনদপ্রাপ্ত কিন্তু প্রস্তুত নয়।

যদি আমরা সত্যিই আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদার সঙ্গে এই সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই শিক্ষার্থীদের জন্য কী ঘটছেÑতা নতুন করে ভাবতে হবে। উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ এবং জাতির ভবিষ্যৎ এর ওপরেই নির্ভর করছে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়