প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৮
চাঁদপুর পৌরসভার মেয়র নির্বাচন ঘিরে জনমুখী কার্যক্রমে সরব সম্ভাব্য প্রার্থীরা

চাঁদপুর পৌরসভার আগামী মেয়র নির্বাচন এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হয়নি, তবে শহরের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের আলোচনায় এখন থেকেই উঠে আসছে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের নাম। কে হবেন আগামী দিনের নগরপিতা—এ প্রশ্নে যখন চায়ের টেবিল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত আলোচনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই সম্ভাব্য প্রার্থীরা ব্যতিক্রমধর্মী জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে শুরু করেছেন। কেউ তীব্র গরমে পথচারীদের মাঝে শরবত বিতরণ করছেন, কেউ গরমে ক্লান্ত মানুষকে তরমুজ খাইয়ে স্বস্তি দিচ্ছেন, আবার কেউ হাতে পাখা নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশান্তির বাতাস পৌঁছে দিচ্ছেন। এমন দৃশ্য ইতোমধ্যে চাঁদপুর শহরের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
|আরো খবর
সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দেখা গেছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি। পৌরবাসীর দৃষ্টি কাড়তে প্রচলিত রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের বাইরে এসে তাঁরা নিচ্ছেন মানবিক ও জনবান্ধব উদ্যোগ। শহরের প্রবীণ বাসিন্দারা বলছেন, আগে নির্বাচনের সময় শুধু পোস্টার আর শ্লোগান দেখা যেতো, এখন মানুষকে কাছে টানতে প্রার্থীরা ভিন্নভাবে কাজ করছেন। এটা ইতিবাচক।
ক্লিন চাঁদপুর নিয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ : চাঁদপুর শহরের পরিচ্ছন্নতা, যানজট নিরসন এবং নাগরিক সচেতনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে 'ক্লিন চাঁদপুর' ও এর প্রতিষ্ঠাতা সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী অ্যাড. নূরুল আমিন খান আকাশ। সংগঠনটির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় শহরের সমসাময়িক সমস্যা নিয়ে সরব থেকেছেন।বিশেষ করে পূজা, ঈদ, জাতীয় দিবস কিংবা বৈশাখী আয়োজনকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির কর্মীরা শহরের সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যতিক্রমী ভূমিকা পালন করেন। এবারের বাংলা নববর্ষে তারা শহরের রাস্তায় আলপনা এঁকে, রোড ডিভাইডারে সবুজ গাছপালা সাজিয়ে এবং নাগরিকদের মাঝে পরিচ্ছন্নতার বার্তা ছড়িয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
স্থানীয়দের মতে, “শুধু নির্বাচনের আগে নয়, দীর্ঘদিন ধরে শহর নিয়ে কাজ করায় ক্লিন চাঁদপুরের কার্যক্রম মানুষের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।"
মোশারফ ফাউন্ডেশনের মানবিক কার্যক্রম : সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় রয়েছে মোশারফ ফাউন্ডেশনের আলহাজ্ব মোশারফ হোসাইন। ঈদুল ফিতরে ব্যতিক্রমী ঈদ উপহার, পহেলা বৈশাখে পথচারী ও সাধারণ মানুষের মাঝে শরবত বিতরণ করে সংগঠনটি ইতোমধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। শুধু তাই নয়, চলমান এসএসসি পরীক্ষাকে সামনে রেখে বিভিন্ন কেন্দ্রের বাইরে অভিভাবকদের বসার জন্যে অস্থায়ী ছাউনি নির্মাণ করেও প্রশংসিত হয়েছে তারা। তপ্ত রোদে অপেক্ষমান অভিভাবকদের জন্যে এই উদ্যোগকে অনেকে ছোট কিন্তু হৃদয়ছোঁয়া হিসেবে দেখছেন। সংগঠনটির মূল প্রতিপাদ্য- এক চাঁদপুর, এক নীতি, কোথাও বৈষম্যের স্থান হবে না। এই স্লোগান ইতোমধ্যে শহরের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।একজন অভিভাবক বলেন, পরীক্ষার সময় রোদে দাঁড়িয়ে থাকা খুব কষ্টের ছিলো। বসার জায়গা করে দেওয়া সত্যিই ভালো উদ্যোগ।
আক্তার মাঝির ভিন্ন বার্তা : চাঁদপুর সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি আক্তার মাঝিও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। তিনি প্রচারণায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন হাতে পাখা নিয়ে। সম্প্রতি শহরের কয়েকটি ব্যস্ত এলাকায় দেখা গেছে, তীব্র গরমে তিনি সাধারণ মানুষের মাঝে হাতপাখা বিতরণ করছেন। রিকশাচালক, পথচারী, দোকানদার—সবার কাছে গিয়ে তিনি খোঁজ নিচ্ছেন তাদের কষ্টের। অনেকে এটিকে মানবিক প্রচারণা হিসেবে দেখছেন।এক রিকশাচালক বলেন, অনেকে ভোটের আগে আসে, কিন্তু এভাবে কাছে এসে কথা বলে কম মানুষই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের প্রতীকী কর্মসূচি মানুষের সঙ্গে আবেগীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
নীরব কৌশলে শাহজাহান : অন্যদিকে অ্যাডভোকেট শাহজাহান তুলনামূলকভাবে নীরব থাকলেও তিনি যে ভিন্ন কোনো কৌশলে এগোচ্ছেন সে আলোচনা রয়েছে শহরজুড়ে।সরাসরি জনসমাগমে কম দেখা গেলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যক্তি পর্যায়ে যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
একজন স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী বলেন, সবাই যেমন দৃশ্যমান কর্মসূচি করছে, শাহজাহান সাহেব হয়তো অন্যভাবে মাঠ তৈরি করছেন।
চাঁদপুর পৌরসভার নাগরিকদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—কে কতটা আন্তরিকভাবে শহরের সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। শহরের প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে—যানজট, ময়লা-আবর্জনা, ড্রেনেজ সংকট, জলাবদ্ধতা, ফুটপাত দখল, সুপেয় পানির সমস্যা। এছাড়া পৌর কর বা অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধি করলেও সে তুলনায় নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত পৌরবাসী।
পৌর নাগরিকরা বলছেন, শুধু নির্বাচনী আয়োজন নয়, বাস্তব কাজই শেষ পর্যন্ত ভোট নির্ধারণ করবে।
শহরের এক ব্যবসায়ী বলেন, শরবত খাওয়ানো ভালো, পানি দেয়া ভালো, তরমুজ দেওয়া ভালো, কিন্তু মানুষ এখন দেখতে চায়—কে শহর বদলাতে পারবে।
এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ তরুণ প্রজন্ম এখন শুধু দলীয় পরিচয় নয়, প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, সামাজিক কাজ ও বাস্তব পরিকল্পনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে পরিচ্ছন্ন শহর, ডিজিটাল সেবা ও আধুনিক পৌর ব্যবস্থাপনার প্রতিশ্রুতি তরুণদের আকৃষ্ট করছে।
চাঁদপুরে এখন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা নয়, সেবার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীরা বুঝতে শুরু করেছেন—জনগণের মন জয় করতে হলে তাদের কাছে যেতে হবে, তাদের সমস্যার পাশে দাঁড়াতে হবে।
এ কারণেই শহরে দেখা যাচ্ছে—শরবত বিতরণ, তরমুজ খাওয়ানো, হাতপাখা দিয়ে বাতাস
পরীক্ষার্থীর অভিভাবকদের সহায়তা, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সৌন্দর্যবর্ধন কর্মসূচি।
চাঁদপুর পৌরসভার নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ততই বাড়বে আলোচনা, কর্মসূচি এবং জনসম্পৃক্ততা। এখন দেখার বিষয়—এই মানবিক আয়োজনের ভিড়ে শেষ পর্যন্ত কে সত্যিকার অর্থে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেন। কারণ শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে জনগণই—কে শুধু প্রচারণা করেছেন, আর কে সত্যিই চাঁদপুরের পাশে ছিলেন।







