প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৫
মাঠ ছাড়েননি জসিম পাটোয়ারী, স্বপ্ন দেখেন চাঁদপুরের ফুটবল নিয়ে
রাইট ব্যাক পজিশনে একসময় দাপিয়ে খেলেছেন চাঁদপুরের এই সাবেক ফুটবলার, জাতীয় দলে খেলার অপূর্ণতা থাকলেও ফুটবল ছাড়েননি এখনো

ফুটবল ছিল তাঁর শৈশবের ভালোবাসা। বড় ভাইয়ের খেলা দেখে যে আগ্রহের জন্মায়, সময়ের সঙ্গে তা পরিণত হয় মাঠের নেশায়। স্কুল ফুটবল থেকে ক্লাব, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয় তাঁর খেলোয়াড়ি জীবন। খেলেছেন চাঁদপুর ও ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে। নেতৃত্ব দিয়েছেন ঢাকা ইস্টার্ন ক্লাবকে। পেয়েছেন পুরস্কার ও সম্মাননা। জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ না পেলেও ফুটবল তাঁকে দিয়েছে পরিচিতি, সম্মান ও শৃঙ্খলার শিক্ষা। বয়স বাড়লেও মাঠ ছাড়েননি। এখনো খেলেন, পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে মাঠমুখী করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন চাঁদপুরের সাবেক ফুটবলার মো. জসিম উদ্দিন পাটোয়ারী।
১৯৭৪ সালের ১০ নভেম্বর চাঁদপুর সদরের আদর্শ মুসলিমপাড়ায় আমজাদ পাটোয়ারী ও আমেনা বেগমের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন মো. জসিম উদ্দিন পাটোয়ারী। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি ছিল তাঁর আগ্রহ। তাঁর বড় ভাই ফুটবল খেলতেন। ভাইয়ের খেলা দেখেই ফুটবলের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়।
১৯৮৮ সালের দিকে চাঁদপুর সরকারি কলেজ মাঠে নিয়মিত ফুটবল খেলতেন জসিম পাটোয়ারী। সেখানে প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন তরুণ একসঙ্গে খেলাধুলা করতেন। একদিন খেলার সময় ফারুক নামে এক সিনিয়র বড় ভাই তাঁকে ক্লাব গঠনের অনুপ্রেরণা দেন। সেই উৎসাহে কয়েকজন মিলে একটি ক্লাব গড়ে তোলেন। সেভেন স্টার নামে ক্লাব পরবর্তীতে ক্লাবটির নাম দেওয়া হয় ব্রাদার্স ইউনিয়ন।
শিক্ষাজীবনে জসিম পাটোয়ারী পড়াশোনা করেন গনি মডেল হাই স্কুলে। স্কুলজীবনেই ফুটবলে তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটে। আন্তঃস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতায় তিনি অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে দল সারা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতায় রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
এরপর চাঁদপুর সরকারি কলেজের হয়েও বিভিন্ন কলেজ টুর্নামেন্টে খেলেছেন তিনি। ফুটবল ক্যারিয়ারে তাঁর পজিশন ছিল রাইট ব্যাক। চাঁদপুর মোহামেডান ক্লাব, চট্টগ্রামের ছত্রদল ক্লাব ও ঢাকার ইস্টার্ন ক্লাবসহ বিভিন্ন দলের হয়ে মাঠে নেমেছেন। ঢাকা ইস্টার্ন ক্লাবের অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ক্লাব থেকেও পেয়েছেন বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা।
জেলা চাঁদপুর ও বিভাগীয় পর্যায়েও খেলেছেন জসিম পাটোয়ারী। কুমিল্লা, সোহরাওয়ার্দী ও শেরে বাংলা কাপসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। তবে দীর্ঘ ফুটবল জীবনে একটি অপূর্ণতা থেকেই গেছে। জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ পাননি তিনি।
ফুটবল জগতের স্মরণীয় একটি ম্যাচ
ফুটবল জীবনের অসংখ্য স্মৃতির মধ্যে একটি ম্যাচ আজও বিশেষভাবে মনে রেখেছেন জসিম পাটোয়ারী। সময়টা ১৯৯০ সালের দিকের। সে সময় বিকেএসপির অনূর্ধ্ব-১৪ দল ডেনমার্কের ডানা কাপ ও সুইডেনের গোথিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফিরেছিল।
জসিম পাটোয়ারী সেই চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য ছিলেন না। বরং চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফেরার পর বিকেএসপি দল যখন মানিকগঞ্জে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল, তখন তাদের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পান জসিম। এক মাস সাত দিনের প্রশিক্ষণে বিকেএসপিতে যাওয়ার সেই অভিজ্ঞতা স্মৃতি স্মরণ করে বলেন,
চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফেরা বিকেএসপির শক্তিশালী দলটির (ডানা) বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল তাঁর জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতার। ম্যাচে বিকেএসপি দল প্রথমে তাদের মূল দল নিয়ে মাঠে নামে। কিন্তু জসিমদের দলের বিপক্ষে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পেতে পারেনি। পরে বিকেএসপির ডানা দলের বি-টিমের খেলোয়াড়দেরও মাঠে নামানো হয়। তাতেও সহজে জয় আসেনি। শেষ পর্যন্ত একটি অফসাইড গোলের মাধ্যমে তারা জয় পায়।
হারলেও চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফেরা বিকেএসপির একটি দলের বিপক্ষে মাঠে খেলার সেই স্মৃতি আজও জসিম পাটোয়ারীর কাছে বিশেষ হয়ে আছে।
যাদেরকে এখনো স্মরণ করেন
ফুটবল জীবনের সেই সময়ের সতীর্থ ও খেলোয়াড়দের কথাও আজও মনে করেন জসিম পাটোয়ারী। তিনি বলেন, তাঁদের মধ্যে কোচ ফারুক ভাইকে আমি খুব মিস করি। উনার দিক নির্দেশনায় আমি ফুটবল জগতে এতোটুকু আসছি, আরো অনেকের কথা মনে পড়ে, যেমন জাহাঙ্গীর পাটোয়ারী, চাঁদ বেকারীর হারুনুর রশিদ, আফজাল, গোলরক্ষক আমিন, মোস্তফা ও আলমগীর প্রমুখ। এছাড়া আরও অনেক খেলোয়াড়ের নাম স্মরণ করেন তিনি। একসঙ্গে অনুশীলন, মাঠে লড়াই ও প্রতিযোগিতার সেই দিনগুলো তাঁর কাছে এখনো স্মৃতির অংশ হয়ে আছে।
খেলাধুলায় এগিয়ে যেতে ফারুক ও মফিজ উনাদের সহযোগিতা ও পরামর্শের কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি। উনার খেলোয়াড়ি জীবনে পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের উৎসাহ ও সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেই খেলাধুলা করতে পারছেন।
ফুটবল উনাকে শিখিয়েছে শৃঙ্খলা
জসিম পাটোয়ারীর কাছে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, জীবন গড়ারও একটি মাধ্যম। খেলাধুলার মাধ্যমে তিনি শৃঙ্খলা শিখেছেন। কোচকে সম্মান করা, নিয়ম মেনে চলা, সময়ের মূল্য দেওয়া, পরিশ্রম করা এবং প্রতিকূলতার মধ্যে নিজেকে ধরে রাখার শিক্ষা পেয়েছেন মাঠ থেকেই।
তাঁর মতে, একজন খেলোয়াড়ের জীবনে শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ম মেনে চলা ও কোচকে সম্মান করার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রম ও সঠিক পরামর্শ অনুসরণ করেই একজন খেলোয়াড়কে এগিয়ে যেতে হয়।
ব্যক্তিগত বর্তমান অবস্থান
পেশাগত জীবনে বর্তমানে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত জসিম পাটোয়ারী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের বাবা। তবে ফুটবল থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যাননি তিনি।
বর্তমানে তিনি চাঁদপুরের সোনালী অতীত ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত আছেন। ৪০ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সী খেলোয়াড়দের নিয়ে সেখানে খেলাধুলা হয়। জসিম পাটোয়ারীও এখনো মাঠে নামেন। চাঁদপুরের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জায়গায় আয়োজিত খেলায় অংশ নেয়ার চেষ্টা করেন। বছরে একবার বিভিন্ন জেলার সোনালী অতীত ক্লাবের খেলোয়াড়দের নিয়ে আয়োজিত খেলায়ও অংশ নেন তিনি।
খেলার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করতে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন।
খেলাধুলা না থাকায় বাড়ছে বিপথগামিতা
বর্তমান প্রজন্মের খেলাধুলাবিমুখতা নিয়ে উদ্বিগ্ন জসিম পাটোয়ারী। উনার মতে, মাঠে নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ না থাকায় অনেক কিশোর-কিশোরী মাদক, কিশোর গ্যাং ও ইভটিজিংসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। খেলাধুলার সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ত রাখা গেলে এসব সামাজিক সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
আগের তুলনায় এখন খেলাধুলার পরিবেশও অনেক বদলে গেছে বলে মনে করেন তিনি। আধুনিক প্রযুক্তি ও মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশু-কিশোরদের মাঠ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। নিয়মিত অনুশীলন, ঘুম ও বিশ্রামের অভাবেও তাদের ফিটনেস ভালো থাকছে না।
তিনি মনে করেন, খেলাধুলার মাধ্যমে শরীর ও মন দুটোই সুস্থ রাখা যায়। তাই কিশোর-কিশোরীদের মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে মাঠে ফেরাতে হবে।
চাঁদপুরের ফুটবলে ফিরুক পুরোনো প্রাণ
চাঁদপুরের ফুটবলের বর্তমান অবস্থা নিয়েও রয়েছে উনার আক্ষেপ। উনার মতে, নিয়মিত লীগ ও আন্তঃটুর্নামেন্ট না হওয়া, ক্লাবগুলো সক্রিয় না থাকা এবং আন্তঃস্কুল ও আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতা নিয়মিত না হওয়ার কারণে নতুন খেলোয়াড় তৈরি হচ্ছে না। বিভাগীয় পর্যায়েও নিয়মিত খেলার সুযোগ না থাকায় চাঁদপুরের ফুটবল পিছিয়ে পড়ছে।
অথচ অতীতে চাঁদপুরের ফুটবলের আলাদা ঐতিহ্য ছিল। এখানকার অনেক খেলোয়াড় ঢাকার মোহামেডান, আবাহনীসহ দেশের বড় বড় ক্লাবে খেলেছেন। চাঁদপুরের খেলোয়াড়রা জাতীয় পর্যায়েও নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন। উনার ছোট ভাই জাহাঙ্গীর পাটোয়ারী জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন এবং ঢাকা মোহামেডান ও ব্রাদার্স ইউনিয়নের মতো ক্লাবেও খেলেছেন।
পুরোনো দিনের খেলোয়াড়দের মধ্যে আরমান, সাব্বির ও মুন্নার মতো খেলোয়াড়দের কথাও স্মরণ করেন জসিম পাটোয়ারী। উনার মতে, আগের মতো প্রতিযোগিতা ও নিয়মিত খেলা থাকলে চাঁদপুর থেকেও আবার অনেক ভালো খেলোয়াড় উঠে আসতে পারে।
স্কুল ও গ্রাম পর্যায় থেকে খেলোয়াড় তৈরির তাগিদ
চাঁদপুর থেকে নতুন খেলোয়াড় তৈরি করতে হলে স্কুল পর্যায় থেকেই ফুটবলকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন জসিম পাটোয়ারী। নিয়মিত আন্তঃস্কুল ও আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতা আয়োজন, ক্লাবগুলোকে সক্রিয় করা এবং থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ফুটবল চালু করার ওপর গুরুত্ব ও পরামর্শ দেন তিনি।
উনার মতে, থানা ও গ্রাম পর্যায়ে নিয়মিত খেলা হলে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসবে। এরপর তাদের প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
জাতীয় দলের অপূর্ণতা, ফুটবলেই বড় প্রাপ্তি
দীর্ঘ খেলোয়াড়ি জীবনে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে খেলার সুযোগ না পাওয়াকে নিজের জীবনের অন্যতম অপূর্ণতা হিসেবে দেখেন জসিম পাটোয়ারী। তবে সেই অপূর্ণতার মাঝেও ফুটবল তাঁকে দিয়েছে অনেক কিছু।
ফুটবল তাঁকে শিখিয়েছে শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও নিয়ম মেনে চলা। মাঠের অভিজ্ঞতা তাঁকে মানুষের সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে চলতে শিখিয়েছে। বিভিন্ন ক্লাব ও প্রতিযোগিতায় খেলে পেয়েছেন পরিচিতি, সম্মান ও অসংখ্য পুরস্কার।
আর্থিক সংকটে হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিভা
খেলাধুলার উন্নয়নে সরকারের আরও সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন জসিম পাটোয়ারী। তাঁর আহ্বান, দেশের প্রতিটি জেলায় নিয়মিত খেলাধুলার আয়োজন করতে হবে। একই সঙ্গে আর্থিকভাবে অসচ্ছল প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়াতে হবে।
জুতা, বুট, জার্সিসহ প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সামগ্রী দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। কারণ অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে খেলাধুলা চালিয়ে যেতে পারেন না। ফলে সম্ভাবনাময় অনেক খেলোয়াড় অকালেই হারিয়ে যান ক্রীড়াঙ্গন থেকে।
আজ বয়স বেড়েছে, জীবনের ব্যস্ততাও বেড়েছে। তবুও ফুটবলের মাঠ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি জসিম পাটোয়ারী। সোনালী অতীত ক্লাবের হয়ে এখনো মাঠে নামেন। নতুনদের খেলাধুলায় উৎসাহ দেন, পরামর্শ দেন।
জাতীয় দলের জার্সি গায়ে না জড়ানোর আক্ষেপ হয়তো তাঁর জীবনে থেকে গেছে। কিন্তু ফুটবল তাঁকে যে ভালোবাসা, পরিচিতি, সম্মান ও শৃঙ্খলার শিক্ষা দিয়েছে, সেটিই তাঁর কাছে বড় প্রাপ্তি। তাই খেলোয়াড়ি জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়েও তাঁর কণ্ঠে একই প্রত্যাশা--মাঠে ফিরুক নতুন প্রজন্ম, আবারও খেলোয়াড়ে সমৃদ্ধ হোক চাঁদপুরের ফুটবল।








