প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৩
স্মৃতির ক্যানভাসে শৈশবের সোনালি দিনগুলো

হারিকেনের মিটিমিটি আলো, গাছতলায় বন্ধুদের আড্ডা, নদীর বুকে ছোট্ট নৌকা, মাটির কলসির ঠাণ্ডা পানি, হাটের দিনের কোলাহল, ডাকপিয়নের চিঠি, শীতের পিঠা আর সন্ধ্যার আজান এসবের মধ্যে মিশে আছে বাংলার এক প্রজন্মের শৈশব। সময় বদলেছে, বদলেছে জীবনযাপনের ধরন। প্রযুক্তির ঝলমলে পৃথিবীতে দঁাড়িয়ে আজও মানুষ ফিরে তাকায় সেই ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে, যেখানে আনন্দের জন্য অনেক আয়োজনের প্রয়োজন হতো না সামান্যতেই ভরে উঠত মন।
মানুষের জীবনে শৈশব এমন এক অধ্যায়, যার পাতা কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয় না। বয়স বাড়ে, জীবনের ব্যস্ততা বাড়ে, দায়িত্বের বোঝা কঁাধে চাপে কিন্তু মনের গোপন কোনো এক কোণে শৈশব চিরকাল বেঁচে থাকে। জীবনের ক্লান্ত বিকেলে কিংবা নিঃসঙ্গ রাতের নির্জনতায় হঠাৎ মনে পড়ে যায় সেই দুরন্ত দিনগুলোর কথা। মনে পড়ে, কীভাবে সামান্য একটি খেলনা, একটি নতুন বই, কয়েকটি রঙিন মার্বেল কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে বিকেলবেলার খেলাই হয়ে উঠত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দ।
শৈশবের আনন্দ ছিল সহজ, নির্মল ও অকৃত্রিম। সেখানে প্রতিযোগিতার চেয়ে বন্ধুত্বের মূল্য ছিল বেশি, প্রাপ্তির চেয়ে ভাগাভাগি করার আনন্দ ছিল গভীর। একটি পেয়ারা বা আম কয়েকজন বন্ধু মিলে খাওয়া, বর্ষার পানিতে কাগজের নৌকা ভাসানো, মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দৌড়ে বেড়ানো কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরাÑএসব ছোট ছোট ঘটনা আজ স্মৃতির ভান্ডারে অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে।
এক সময় শিশুরা আকাশের দিকে তাকিয়ে মেঘের আকৃতি দেখে কল্পনার রাজ্য তৈরি করত। কখনো মেঘের ভেতর হাতির ছবি, কখনো পাহাড়, কখনো আবার বিশাল কোনো জাহাজ দেখতে পেত। সেই কল্পনার জগতে ছিল না কোনো সীমারেখা। ছিল না জীবনের কঠিন হিসাব-নিকাশ। ছিল শুধু মুক্ত আকাশের নিচে অবাধে বেড়ে ওঠার আনন্দ।
আজকের শিশুদের সামনে বিনোদনের অগণিত উপকরণ। স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ভিডিও গেম ও ইন্টারনেট মুহূর্তেই তাদের সামনে হাজির করছে এক বিশাল ভার্চুয়াল পৃথিবী। অথচ আগের দিনের শিশুদের বিনোদনের জন্য প্রয়োজন হতো প্রকৃতি, বন্ধুবান্ধব আর একটু অবসর। সেই সামান্য উপকরণ দিয়েই তারা তৈরি করত আনন্দের বিশাল এক জগৎ।
গ্রামের বড় কোনো বটগাছ, পুকুর পাড়, নদীতীর কিংবা আমগাছ ছিল শিশু-কিশোরদের প্রিয় মিলনস্থল। বিকেল হলেই একে একে জড়ো হতো বন্ধুরা। কেউ স্কুলের গল্প বলত, কেউ নতুন শেখা কোনো ছড়া শোনাত, কেউ আবার বানিয়ে বানিয়ে ভূতের গল্প বলত। গল্পের আসর কখন যে সন্ধ্যায় গড়িয়ে যেত তা বোঝার উপায় থাকত না।
কখনো চলত লুকোচুরি, দঁাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, কানামাছি কিংবা ডাংগুলি খেলা। কারও হাতে থাকত মার্বেল, কারও কাছে লাটিম। সামান্য একটি খেলাকে কেন্দ্র করে কখনো অভিমান হতো, আবার কিছুক্ষণ পরেই সব ভুলে একসঙ্গে খেলায় মেতে উঠত সবাই।
বন্ধুত্বের সেই সম্পর্ক ছিল অনেকটাই স্বতঃস্ফূর্ত। কারও পরিবারের আর্থিক অবস্থা কেমন, কার পোশাক কত দামি কিংবা কে কোন ব্র্যান্ডের জুতা পরে এসেছেÑএসব দিয়ে বন্ধুত্বের গভীরতা মাপা হতো না। বরং যার কাছে নতুন একটি বল থাকত, সে সবার সঙ্গে ভাগ করে খেলত। কারও বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলে প্রতিবেশী বন্ধুকেও ডেকে খাওয়ানোর প্রবণতা ছিল।
আজ নগরায়ণ, ব্যস্ত জীবন ও প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের কারণে অনেক জায়গায় সেই গাছতলার আড্ডা হারিয়ে যাচ্ছে। শিশুরা আগের মতো অবাধে মাঠে খেলার সুযোগও সব জায়গায় পাচ্ছে না। তবু পুরোনো দিনের বন্ধুর সঙ্গে বহু বছর পর দেখা হলে সেই গাছতলার স্মৃতি ফিরে আসে। বয়সের ব্যবধান, পেশাগত পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান মুহূর্তের জন্য যেন মিলিয়ে যায়। মনে হয়, সময়ের স্রোত পেরিয়ে সবাই আবার ফিরে গেছে সেই দুরন্ত শৈশবে।
বাংলার প্রকৃতি ও জীবন নদীনির্ভর। নদী, খাল, বিল, পুকুর আর জলাভূমির সঙ্গে বেড়ে ওঠা বহু মানুষের শৈশব জড়িয়ে আছে পানির সঙ্গে। বর্ষা এলেই মাঠঘাট ডুবে যেত, খাল-বিলে পানি বাড়ত। কোথাও কোথাও বাড়ির উঠোন পর্যন্ত পানি চলে আসত। তখন ছোট্ট নৌকায় চড়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার দৃশ্য ছিল পরিচিত। শিশুদের কাছে নৌকা ছিল বিস্ময়ের এক জগৎ। মাঝির বৈঠার ছন্দে নৌকা যখন পানির বুক চিরে এগিয়ে যেত, তখন দুপাশের সবুজ গাছপালা, ধানের খেত আর দূরের গ্রাম যেন চলমান ছবির মতো মনে হতো। নদীর ঢেউয়ে সূর্যের আলো ঝিকমিক করত। বাতাসে ভেসে আসত কাদামাটির গন্ধ।
কেউ নৌকায় বসে মাছ ধরার চেষ্টা করত, কেউ পানিতে হাত ডুবিয়ে ঢেউ তুলত। আবার অনেক শিশু বর্ষার পানিতে কাগজের নৌকা ভাসিয়ে প্রতিযোগিতা করতÑকার নৌকা কত দূর যায়। ছোট্ট সেই নৌকার সঙ্গে ভেসে যেত তাদের কল্পনা, স্বপ্ন আর আনন্দ।
গ্রামের হাট শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, ছিল সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে হাট বসত। সকাল থেকেই আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষ আসতে শুরু করত। কেউ আসত ধান, চাল, শাকসবজি কিংবা মাছ নিয়ে কেউ কিনতে আসত পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
হাটের দিন শিশুদের কাছে ছিল বিশেষ আনন্দের। বাবা-মায়ের সঙ্গে হাটে যাওয়ার সুযোগ পেলে তারা খুব খুশি হতো। হাটে খেলনা, বঁাশি, মাটির পুতুল, রঙিন বেলুন, জিলাপি, বাতাসা কিংবা মুড়ি-মুড়কির দোকান তাদের আকর্ষণ করত। অনেক শিশু আগে থেকেই আবদার করে রাখতÑহাটে গেলে একটি খেলনা কিংবা মিষ্টি কিনে দিতে হবে।
হাটে গিয়ে পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হতো। এক দোকানে দঁাড়িয়ে চলত গ্রামের খবর, অন্য দোকানে জমত গল্প। কৃষক, জেলে, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষÑবিভিন্ন পেশার মানুষের মিলন ঘটত সেখানে। হাট ছিল অর্থনৈতিক লেনদেনের পাশাপাশি গ্রামীণ সমাজের প্রাণকেন্দ্র। কখনো হাট থেকে ফেরার পথে হাতে থাকত ছোট্ট বঁাশি, তাল পাখা কিংবা মাটির খেলনা। বাড়ি ফিরে সেই খেলনা নিয়ে বন্ধুদের সামনে গর্ব করে দেখানো হতো। পরদিন স্কুলে গিয়ে হাটের গল্প শোনানো ছিল আরেক আনন্দ।
উজ্জ্বল হোসাইন : লেখক, সাংবাদিক ও সংগঠক।
(চলবে... আগামী সংখ্যায় সমাপ্য।)








