প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১১
সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার
ছায়া শিকারি

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
এগারো.
ধীরে ধীরে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা এগিয়ে যাচ্ছে গণভবনের দিকে। এ সময় উপরে একটি বিমানের শব্দ শোনা যায়। বিপ্লবীদের মধ্য থেকে কে যেন একজন বলে উঠল, ‘প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে গেছেন!’
উল্লাসে ফেটে পড়ে জনতা, সারা দেশে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। এখান থেকে মানুষ কথা বলতে পারবে, গান গাইতে পারবে, কবিতা লিখতে পারবে, সমালোচনা করতে পারবে।
তারপর কেটে যায় তিনটি দিন। দেশ থেকে পালিয়েছে শয়তানের দল—যারা এতদিন দেশটাকে স্তব্ধ করে রেখেছিল।
তিন দিন দেশে কোনো সরকার ছিল না। হঠাৎ চতুর্থ দিনে ইরফান ও তার সাথীদের কাছে চাবুক সিংয়ের কাছ থেকে খবর আসে, ‘তোমরা সবাই গণভবনে এসো। তোমাদের দেশের ক্ষমতার আসনে বসানো হবে।’
ইরফান তার সঙ্গীদের নিয়ে চাবুক সিংয়ের সাথে দেখা করে। চাবুক সিং ইরফানকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে বলে, ‘আপনাদের জন্যই আজ দেশ শব্দ খুঁজে পেয়েছে। মানুষ আজ কথা বলতে পারছে। তাই আপনাকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করতে চাই। আর আপনাদের বাকি সাথীদের উপদেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে নিয়োগ দিয়ে দেশকে রক্ষা করতে চাই।’
ইরফানের চোখে আগুন। সে উত্তর দেয়, ‘আমি সরকারের প্রধান হতে এখানে আসিনি; আর সরকার পরিচালনার জন্যও রাস্তায় নামিনি। আমাদের হাজার হাজার সাথীর মৃত্যু হয়েছে, রক্তের দাগ এখনও দেয়ালে ও রাস্তায় লেগে আছে। তাদের রক্তের ওপর পা দিয়ে আমরা কেউ সরকার পরিচালনায় অংশগ্রহণ করতে চাই না।’ কথাগুলো বলে ইরফান তুষার ও ইমতিয়াজসহ তার সাথীদের দিকে তাকাল। দেখল, তাদের চোখের ভাষাও ঠিক একই রকম।
ইমতিয়াজ বলল, ‘ইরফানের কথাই আমাদের কথা। আমরা একজন যোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের প্রধান করতে চাই, আর সাথে থাকবেন দেশ পরিচালনা করার মতো আরও যোগ্য ব্যক্তিরা। আমরা ছাত্র, আমাদের স্থান হোস্টেলে ও পড়ার টেবিলে। আমরা মানুষের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছি, রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার জন্য নয়।’
চাবুক সিং প্রশ্ন করল, ‘তাহলে আপনারা প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কাকে যোগ্য ভাবছেন?’
ইরফান উত্তর দিল, ‘আরিন তাসনীম। তিনি একজন বাংলাদেশী বিজ্ঞানী, বর্তমানে বিদেশের মাটিতে আছেন। বিদেশে তাঁর মেধার জ্যোতি ছড়াচ্ছে। তাঁকে আমরা দেশে এনে তাঁর হাতে দেশের ভার অর্পণ করতে চাই, যাতে এই দেশটা সত্যিই মানুষের বেঁচে থাকার ও কথা বলার উপযোগী হয়।’
সায় দিলেন চাবুক সিং। তিনি বললেন, ‘তাহলে তা-ই হবে। তাঁর সাথে আমরা এখনই যোগাযোগ করছি।’
ফোনে কথা বলছেন চাবুক সিং। কিন্তু আরিন তাসনীম বিষয়টা শুনে রাজি হচ্ছেন না। তাই ইরফানকে কথা বলার দায়িত্ব দেওয়া হলো। ইরফানের কথায় রাজি হয়ে দেশে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন আরিন তাসনীম।
এরপর পাঁচ দিনের মাথায় রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিলেন আরিন তাসনীম। সেই সাথে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের যোগ্য ব্যক্তিদের বাকি উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হলো।
সবাই মিলে গড়ে তোলেন একটি নতুন ‘স্পন্দন সংবিধান’—একটি নতুন নৈতিক চুক্তি, যেখানে ভাষা কেবল কণ্ঠের নয়; ভাষা হৃদয়ের, চোখের, স্পর্শের, নীরবতার এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের।
ইরফান ও বৃষ্টি তৈরি করে ‘শব্দহীন বিদ্যালয়’, যেখানে শিশুদের শেখানো হয় কীভাবে অনুভব করতে হয়, কীভাবে বোঝাতে হয়, কীভাবে ভালোবাসতে হয়—শব্দ ছাড়াই।
এখন আর কেউ বলে না, “আমরা নিঃশব্দের শহরে বাস করি।” এখন তারা বলে, “আমরা সেই শহরের মানুষ, যারা নীরবতা দিয়ে ভাষা বানিয়েছে।”
আর নাহার ও আরাধ দুজনেই হঠাৎ করে হারিয়ে যায়। ইরফান ও তার বন্ধুরা তাদের খুঁজতে থাকে পাহাড়ে, গুহায় ও উপত্যকায়। কিন্তু তাদের আর পাওয়া যায়নি।
তবে এর বহু বছর পর একদিন সন্ধ্যায়, একটি বিলবোর্ডে ভেসে ওঠে সেই প্রতীকী ভাষা : — ‘‘নিভে যাও রূপকথার শব্দ... একদিন তোমার ওজন বুঝে ফেলবে।’’
বিপ্লবের ছয় মাস পর—শিশুরা এখন শব্দে কথা বলে, অনুভবে দেশকে সম্মান করে, হৃদয়-ভাষা মানুষের উচ্চারণে।
রুহান এখন ফিরে গেছে তার মা-বাবার কাছে। সে নাহার ও আরাধের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি ইরফানের কাছ থেকে জানতে পারে। তারপর এই রহস্যের যবনিকা টানতে তাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। সে বিশ্বাস করে, তারা হারিয়ে যায়নি, বরং এক নতুন ভাষার স্তরে পৌঁছেছে।
ইমতিয়াজ ও অনন্যার মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। কেউ চায় হৃদয়-ভাষাকে সংরক্ষণ করতে, কেউ চায় তা প্রযুক্তির মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে। এরই মধ্যে একটি গোষ্ঠী গড়ে ওঠে, যাদের নাম ‘নীরব রক্ষক’—যারা মনে করে ভাষার অতিরিক্ত ব্যবহার আবারও মানুষকে ভাঙবে।
রুহান একদিন একটি পুরোনো গুহায় খুঁজে পায় এক দেয়ালচিত্র, যেখানে আঁকা আছে এক অদ্ভুত প্রতীক। সেই প্রতীক পাঠ করে সে বুঝতে পারে, নাহার ও আরাধ এখন শব্দের ঊর্ধ্বে এক ‘অভ্যন্তরীণ ভাষা’ তৈরি করেছে, যেখানে অনুভব ও নৈতিকতা একাকার।
রুহান ফিরে এসে দাঁড়ায় ‘ধ্বনি চত্বরে’। সে কিছু বলে না, শুধু সবার চোখের দিকে তাকায়। তার হৃদয়ের কম্পন ছড়িয়ে পড়ে—“ভাষা ফিরে এসেছে, কিন্তু আমরা কি এখনো শুনতে জানি?”
শাসকগোষ্ঠী পালিয়ে গেলেও তাদের শিষ্যরা রয়ে গেছে।
রুহান বড় হয়েছে শব্দহীন বিদ্যালয়ে, কিন্তু তার ভেতরে এক অস্থিরতা। সে অনুভব করে, কিছু একটা হারিয়ে যাচ্ছে—একটি ভাষা, যা শব্দের নয়, কিন্তু অস্তিত্বের ছিল। এক রাতে সে খুঁজে পায় ইরফানের লেখা পুরোনো একটি নোটবুক। সেখানে আঁকা এক প্রতীক, যার নিচে লেখা : “যদি হৃদয় নিঃশব্দ হয়, তবে ভাষা মৃত।”
রুহান বেরিয়ে পড়ে পাহাড়, গুহা ও উপত্যকায়—যেখানে একসময় নাহার ও আরাধ হারিয়ে গিয়েছিল। এক গুহার দেয়ালে সে দেখে একটি চিত্র—দুটি চোখ, দুটি হাত আর একটি হৃদয়। চোখের নিচে লেখা : “আমরা শব্দ ছেড়েছি, কিন্তু নীরব হইনি।”
সে বুঝতে পারে, নাহার ও আরাধ এখন এক নতুন স্তরে পৌঁছেছে, যেখানে ভাষা আর বাহ্যিক নয়, বরং অভ্যন্তরীণ কম্পন। তারা এখনো আছে মানুষের অনুভবের গভীরে—প্রতিটি নীরব চাহনিতে, প্রতিটি অশ্রুতে।
স্পন্দন সংবিধানে ফাটল ধরে। একটি নতুন গোষ্ঠী ‘নীরব রক্ষক’ চায় হৃদয়-ভাষাকে আবার গোপন করতে। তারা বলে, “ভাষা আবার অস্ত্র হয়ে উঠছে, আবার বিভাজন তৈরি করছে।”
অন্যদিকে, অনন্যা চায় হৃদয়-ভাষাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে—একটি ‘স্পন্দন নেটওয়ার্ক’, যেখানে অনুভব হবে সংক্রমণযোগ্য। ইমতিয়াজ দ্বিধায় পড়ে। সে জানে, ভাষা ছড়িয়ে দিলে তা বিকৃত হয়, কিন্তু গোপন রাখলে তা মরে যায়।
রুহান ফিরে আসে শহরে। সে গিয়ে দাঁড়ায় সেই পুরোনো ‘ধ্বনি চত্বরে’—যেখানে একদিন নাহার বলেছিল, “আমি বলব।”
আজ সেখানে আবার বিশাল স্ক্রিন ঝুলছে, আবার নতুন আদেশ প্রচারিত হচ্ছে: “ভাষা নিয়ন্ত্রিত হোক, অনুভব অনুমোদিত হোক।” রুহান কিছু বলে না। সে শুধু চোখ বন্ধ করে, বুকের ওপর হাত রাখে। তার হৃদয়ের কম্পন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। মানুষ থেমে যায়। একটি শিশু তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, “মা, আমি অনুভব করতে পারি।”
সেই রাতে শহরের আকাশে ভেসে ওঠে এক নতুন বার্তা : “ভাষা ফিরে এসেছে, এখন আমাদের শিখতে হবে কীভাবে তা হারাব না।”
রুহান এখনো খুঁজে চলেছে। নাহার ও আরাধের অনুপস্থিতি যেন শহরের হৃদয়ে এক শূন্যতা হয়ে রয়ে গেছে—একটি অসমাপ্ত বাক্য, যার শেষ শব্দ কেউ জানে না।
এক রাতে, শহরের প্রান্তে এক ভবঘুরে এসে আশ্রয় নেয় ‘শব্দহীন বিদ্যালয়ের’ পাশে। সে কারও সঙ্গে কথা বলে না, শুধু দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত দীপ্তি—যেন সে এমন কিছু জানে, যা বাকিরা জানে না। রুহান তাকে দেখে থমকে যায়। তার মনে হয়, এই চাহনি সে কোথাও দেখেছে—কোনো পুরোনো ছবিতে, কোনো হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিতে। রুহান তাকে প্রশ্ন করে, ‘কে তুমি?’
লোকটি উত্তর দেয়, ‘আমার নাম জামশেদ। আমি এসেছি তোমাদের শব্দহীনতা থেকে মুক্ত করতে। তোমরা আবার তোমাদের হারানো শব্দমালা ফিরে পাবে, আর আমিই হব তোমাদের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।’
সেই রাতেই শহরের আকাশে ভেসে ওঠে এক অদ্ভুত প্রতীক—তিনটি বিন্দু, একটি রেখা আর একটি চোখ। কেউ বুঝতে পারে না এর অর্থ। কিন্তু রুহান জানে, এটি সেই প্রতীক, যা সে গুহার দেয়ালে দেখেছিল।
পরদিন সকালে শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি শিশু খুঁজে পায় এক ছেঁড়া কাগজ। তাতে লেখা : “আমরা ফিরে এসেছি এই নিঃশব্দ শহরের প্রধানমন্ত্রীকে সাথে নিয়ে, যিনি তোমাদের মুখের ভাষা পরিপূর্ণভাবে ফিরিয়ে দেবেন। তবে আমরা আর আগের মতো নই। আমাদের খুঁজো না, আমাদের অনুভব করো।”
রুহান এক রাতে স্বপ্ন দেখে, সে হাঁটছে এমন এক শহরে যেখানে সবকিছু আছে, কিন্তু সবকিছুই ছায়া। ছায়া-মানুষ, ছায়া-বই, ছায়া-গান। শুধু একটি জায়গায় আলো—এক পুরোনো লাইব্রেরি, যেখানে বসে আছে জামশেদ, নাহার ও আরাধ।
তারা কিছু বলে না। জামশেদ বসে বসে পাউরুটি খাচ্ছে, আর আরাধ শুধু তাকিয়ে আছে। নাহার তার দিকে হাত বাড়ায়। হাত ছুঁতেই রুহান অনুভব করে এক বিস্ফোরণ—যেন তার হৃদয়ের প্রতিটি কোষে ঢুকে যাচ্ছে এক নতুন ভাষা। চোখে দেখা যায় না এমন ভাষা, যা হৃদয়ের গভীরে জ্বলছে।
রুহানের ঘুম ভাঙে। তার বুকের ওপর আঁকা সেই প্রতীক—তিনটি বিন্দু, একটি রেখা, একটি চোখ। সে জানে, এটা স্বপ্ন ছিল না। জামশেদের সাথে নাহার ও আরাধ ফিরে এসেছে, কিন্তু তারা এখন আর ব্যক্তি নয়—তারা ভাষার আত্মা।
শহরের এক কোণে একটি পুরোনো ট্রামের গায়ে কেউ লিখে গেছে, “তারা এখন ছায়া নয়, তারা প্রতিধ্বনি।”
আর জামশেদ নামের লোকটা—যাকে এখন কেউ চেনে না, সে এক শিশুর কানে ফিসফিস করে বলে, “যদি একদিন কেউ হারিয়ে যায়, তাকে খুঁজো না। বরং নিজের হৃদয়ে তাকাও। হয়তো সে সেখানেই আছে।”
শিশুরা বিদ্যালয়ে পড়তে থাকে দেড় শ বছর আগের ইতিহাস। ঘুম থেকে জেগে উঠল ইরফান ও বৃষ্টি। তারা জেগে উঠে শিশুদের এসব পড়তে দেখে মনে মনে ভাবল, দেড় শ বছর আগের ইতিহাস আর স্কুলে পড়ানো যাবে না। বাঙালি এসব থেকে শিক্ষা নেয় না; বরং এসব শুনে শুনে তারা দেড় শ বছর পিছিয়ে যায়।
এখনকার স্কুলে পড়ানো হবে কীভাবে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশকে আরও শক্তিশালী করা যায়; কীভাবে জ্ঞানগর্ভে বাঙালি জাতি আরও উচ্চতর আসনে উঠতে পারবে, নেতৃত্ব দিতে পারবে। আগের শাসকরা যে ভুল করে গেছে, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া যাবে না।
নতুনভাবে, নতুন নিয়মে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। সে তাসফিয়া, অনন্যা ও ইমতিয়াজকে কল করে একটি মিটিং ডাকে। কী আশ্চর্য, সেখানে সেদিন হঠাৎ করে নাহার ও আরাধও এসে উপস্থিত হয়! সবাই অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, ‘আরাধ ও নাহার, তোমরা এতদিন কোথায় ছিলে?’
‘আমরা এই দেশ নতুন করে বিনির্মাণের ভাবনায় গুহায় ব্যস্ত ছিলাম। তোমাদের সাউন্ড পেয়ে হাজির হলাম। এসো, আমরা সবাই মিলে নতুনভাবে দেশটা গড়ি।’ (চলবে...)








