প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৬
৩ ঘণ্টা ৭ মিনিট

ফেব্রুয়ারি মাসের ১৭ তারিখ। রুটিনমাফিক সকালে ঘুম থেকে উঠে কোচিংয়ে চলে যায় হাসিব। কোচিং থেকে সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে বাসায় ফিরে খাবার খায়। এই পর্যন্ত সবকিছু ঠিক ছিল। সকাল ১০টা ৩০ মিনিট। দিনটি ছিল মঙ্গলবার। সকালের নাশতা খেয়ে কাউকে কিছু না বলে মায়ের পেছন পেছন বাসা থেকে বের হয়ে যায় হাসিব। এর আগে মায়ের কাছে বন্ধু ইমতিয়াজের বাসায় যাওয়ার প্রস্তাব করলে মা বলেন, ‘না বাবা, তোমার খালামনির সঙ্গে বাসায় থাকো। আম্মু হাসপাতাল থেকে আসছি।’ এই বলে মা বাসা থেকে বের হয়ে যান।
হাসিব বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান। তার জন্ম গ্রামের বাড়িতেই। বয়স ১২ বছর ১ মাস ৪ দিন। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে ছোট বোন সোহানা আজ্বরিনের বয়স ৮ বছর। সে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। বাবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মা গৃহিণী। চাচা-চাচি, জ্যাঠা-জ্যাঠি, চাচাতো-জ্যাঠাতো ভাই-বোন ও দাদাকে নিয়ে যৌথ পরিবারে থেকে গ্রামের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে হাসিব। গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যেত সে। সেই মেঠোপথের কথা এখনো ভুলতে পারেনি। বাড়ির আঙিনার ধুলাবালির গন্ধও এখনো যেন কাটেনি তার শরীর থেকে।
বাসা থেকে বের হয়ে একা একা হঁাটতে হঁাটতে হাসান আলী স্কুল মাঠে চলে যায় হাসিব। সেখানে কাউকে না পেয়ে চলে যায় শহীদ মিনারে। শহীদ মিনার থেকে আবারও স্কুল মাঠে ফিরে আসে। সেখানেই বন্ধু নিশাতের সঙ্গে দেখা হয় তার। তারা দুজনই হাসান আলী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। দুই বন্ধু পরামর্শ করে, আর কাউকে সঙ্গী করা যায় কি না। সিদ্ধান্ত হয়, মাঠসংলগ্ন ভবনের চতুর্থ তলায় বসবাসরত সাফিনকে সঙ্গে নেওয়া হবে। কথা অনুযায়ী কাজ। সাফিনের বাসায় গিয়ে তাকে নিয়ে তিন বন্ধু বের হয় এক অজানা উদ্দেশ্যে।
শহরের অজানা অলিগলিতে মনের আনন্দে চলতে থাকে তিন বন্ধু। সূর্য তার নির্ভেজাল কিরণ ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে ধরণিতে। উত্তপ্ত দুপুর। কিন্তু তিন বন্ধুর কাছে তা কিছুই মনে হচ্ছে না। রেললাইনের পাশ দিয়ে হঁাটতে শুরু করে তারা। পরিচিত স্থানগুলোর মধ্যে পুরান বাজার সেতু, সদর হাসপাতাল ও ডাকাতিয়া নদীর তীর ঘুরে পুনরায় নিজ বিদ্যালয়ের মাঠে ফিরে আসে তিন বন্ধু।
ক্লান্তি তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। শহরে আসার এক বছরের মধ্যে এর আগে তিন বন্ধু কখনো এভাবে একত্র হয়নি। তারা শুধু সহপাঠী হিসেবে একে অপরের সঙ্গে পরিচিত। এ ছাড়া কেউ কারও অন্য কোনো পরিচয় জানে না। কারও পারিবারিক পরিচয়ও তাদের জানা নেই। মা-বাবা কিংবা পরিবারের কথা যেন তাদের মনেই নেই। প্রকৃতপক্ষে, এই বয়সের ছেলেরা এমনই হয়। এই বয়সের ছেলেদের ব্যাপারে অভিভাবকদের সব সময় সতর্ক থাকা জরুরি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ গল্পের সেই বিখ্যাত উক্তিটিই তাদের জন্য প্রযোজ্যÑ‘বিশেষত, তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নেই।’
ঘণ্টাখানেক পর হাসিবের মা হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে ছেলেকে না পেয়ে বোনকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হাসিব কোথায়?’
বোন বলল, ‘আপনার সঙ্গেই তো বাসা থেকে বের হয়ে গেছে।’
মা হতভম্ব হয়ে গেলেন। কারণ, শহরে আসার পর থেকে এত দীর্ঘ সময় সে কখনো বাসার বাইরে থাকেনি। শুরু হলো মায়ের পেরেশানি। আশপাশের পরিচিত জায়গাগুলোতে খেঁাজ নেওয়া হলো। না, হাসিবকে পাওয়া যাচ্ছে না। সময় যত যাচ্ছে, মায়ের দুশ্চিন্তা ততই বাড়ছে। মা পাগলের মতো হন্যে হয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটছেন। এভাবে কেটে গেল আরও এক ঘণ্টা।
হাসিব সকালে বাসা থেকে বের হয়ে এখনো ফেরেনিÑএ কথা হাসিবের মা তার বাবাকে জানালেন। বাবা কথা শুনে স্বাভাবিকভাবে বললেন, ‘তো, সে কোথায় গেল, বলে যায়নি?’
মা জবাব দিলেন, ‘না।’
বাবা প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কোথায় ছিলে?’
মা বললেন, ‘আমি চক্ষু হাসপাতালে গিয়েছিলাম সাইফার ডাক্তারের জন্য।’
কথা শুনে বাবা আর কালক্ষেপণ না করে সহকর্মীদের বিষয়টি জানালেন। সহকর্মীরাও দ্রুত বেরিয়ে পড়তে বললেন। দুপুরের খাবার খাওয়ার চেষ্টা করেও মুখে খাবার তুলতে পারছেন না তিনি। সবকিছু যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। নানা রকম দুশ্চিন্তা মাথায় আঘাত হানছে। কী হলো? কোথায় যেতে পারে ছেলেটা? আমার ছেলে তো কারও শত্রু হতে পারে না। আর শত্রু হবেই বা কেন? শহরে তো কারও সঙ্গে এখনো ভালো করে পরিচয়ই হয়নি তার।
নানা দুশ্চিন্তায় বিভোর হয়ে বাবা পায়ে হেঁটে কিছুদূর গিয়ে অটোরিকশায় উঠলেন। তারপর অটোরিকশা থেকে নেমে আবার কিছুদূর পায়ে হেঁটে সিএনজিতে উঠলেন। কোন পথে যাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেনÑএসবের কোনো কিছুই যেন কাজ করছে না হাসিবের বাবার মাথায়। তারপরও শহরে যত পরিচিতজন রয়েছেন, সবার কাছে ফোন করে জানতে চাইছেন, হাসিব তঁাদের বাসায় গিয়েছে কি না। না, কোথাও হাসিবের সন্ধান মেলেনি।
একটু পরপর হাসিবের মা ফোন করে জানাচ্ছেন, হাসিবকে পাওয়া যাচ্ছে না। মোবাইলের অপর প্রান্ত থেকে বারবার একটি কথাই উচ্চারিত হচ্ছে, ‘আমার ছেলে তো বাসার বাইরে এতক্ষণ কাটায়নি। আমি এখন কী করব?’
ইতিমধ্যে বন্ধু ইমতিয়াজ হাসিবের সঙ্গে খেলতে চলে আসে। ইমতিয়াজকে দেখে মা আরও অস্থির হয়ে পড়েন। কারণ, হাসিবের ইমতিয়াজের বাসায় যাওয়ার কথা ছিল। মা আবার ইমতিয়াজদের বাসা প্রফেসর পাড়ায় ছুটে গেলেন। সেখানে না পেয়ে আবার দৌড় দিলেন শহীদ মিনারের দিকে। এরপর ছুটলেন রেললাইনের পাশে। আবার সরকারি কলেজ মাঠ হয়ে নিজের বাসায় ফিরলেন।
সন্তান নিখেঁাজ হওয়ায় আজ হাসিবের মা ভুলে গেছেন যে তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত একজন রোগী। তঁার শরীর সব সময় দুর্বল থাকে। কিন্তু আজ কোনো দুর্বলতাই তঁাকে আটকে রাখতে পারেনি। শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, এক গলি থেকে অন্য গলিতে বাতাসের মতো ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি।
এদিকে হাসিব ও তার দুই বন্ধু ছায়াবাণী মোড় হয়ে নতুনবাজার পণ্টুনে চলে যায়। সেখান থেকে তারা ট্রাক রোড দিয়ে পূর্ব দিকে গ্রামের দিকে যাবে। এই অঞ্চলগুলোতে তারা কখনো আসেনি। তিন বন্ধু কথা বলতে বলতে অজানা উদ্দেশ্যে চলতে থাকে। একসময় তারা গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করে এবং পথ হারিয়ে ফেলে।
হঠাৎ এক বন্ধু বলে উঠল, ‘আমি সামনের রাস্তা আর চিনি না।’
বাকি দুজন বলে উঠল, ‘এখন আমরা কোন দিকে যাব?’
ভাবনায় পড়ে গেল তারা। তারপরও হঁাটতে থাকে। কিছুদূর যাওয়ার পর এক বয়স্ক লোকের সঙ্গে দেখা হলো। এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করল, ‘আমরা নতুনবাজার যাব কোন পথে?’
বয়স্ক লোকটি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাদের বাসা কোথায়?’
তারা জবাব দিল, ‘আমরা নতুনবাজারে থাকি।’
বয়স্ক লোকটি হেসে বললেন, ‘তোমাদের বাসা নতুনবাজারে? আর তোমরা পথ চেনো নাÑএটা হয়?’ এই বলে তিনি বটতলার দিকের রাস্তা দেখিয়ে দিলেন। তারা আবার আপনমনে হঁাটতে থাকে।
তিন বন্ধু নতুনবাজার হয়ে নিজেদের বিদ্যালয়ের মাঠে ফিরে আসে। হাসিব বাসায় হাজির হয় দুপুর ১টা ৩৭ মিনিটে। হাসিবের মা তার বাবাকে ফোন করে জানালেন, এইমাত্র হাসিব বাসায় এসেছে।
কথা শুনে বাবা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। তিনি পানির ট্যাংকির মোড় থেকে পুনরায় কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা হলেন।
ছবি-৩১
ক্ষুদীরাম দাস
বুকের গভীরে নীরবে রক্তক্ষরণ
বিশ্বাসের সুতো ছিঁড়ে গেল আজ এক নিমিষের ঝড়ে,
পরের মানুষ বাড়লো ঘরেই, নিজের মানুষ পর করে।
ঢাকা যাওয়ার বাহানা গড়ে ফিরলো যখন ঘরে,
বুকের ভেতর জ্বললো আগুন, দৃশ্য দেখার পরে।
যাকে আমি ভেবেছিলাম সুখের ঘরের নদী,
সে-ই তো আজ ডুবিয়ে দিলো স্রোতের অবধি।
হাতেনাতে ধরা পড়ে নীরব হলো রাত,
কাকে দেবো দোষ বলো, কার ওপর এই ঘাত?
অভিযোগের পাহাড় ঠেলে ঝগড়া করিনি আর,
কান্না চেপে মেনে নিলাম নীরব পরাজয় আমার।
পঁাচ লাখ টাকা কাবিন বেঁধে বিয়ের দিলাম আয়োজন,
পরের হাতে সঁপে দিলাম নিজের ছিলো যে জন।
চোখের জলে বিদায় দিয়ে তুলে দিলাম বাসে,
অদেখা এক যন্ত্রণাতে বিশ্বসমাজ হাসে।
সবাই ভাবে শান্ত আমি, হলাম কতো বড়,
কে বোঝে মোর বুকের ভেতর বিষের পাথর জড়ো!
সংসারের এই নাট্যমঞ্চে একলা হলাম আমি,
সম্পর্কের এই চরম বিদায়ে মূল্য হলো দামী।
যে বিশ্বাসে বঁাধলাম ঘর সবিই হলো ছাই,
আজকে আমার সান্ত্বনা যে নিজের কাছেই নাই।
লজ্জা ঢাকা হাসির আড়ালে বুকটা ফাটে একা,
এমন চরম নিষ্ঠুরতা ভাগ্যে ছিলো লেখা।
সব হারিয়ে দঁাড়িয়ে রইলাম শূন্য পথের পাড়ে,
এমন ব্যথার বিচার বলো কে দেবে এই সংসারে?
***
আমি বোকা হতে চাই
আমি একটু বোকা হতে চাই,
চতুরতার এই ভিড়ে শান্তি খুঁজে পাই।
যেখানে নেই কোনো পঁ্যাচ বা ছলে বল,
মন খুলে যেখানে গায় ঝিরিঝিরি জল।
সব বুঝে সবসময় চালাক হয়ে থাকা,
বুকে যেন পাথরের মস্ত এক ঢাকা।
তার চেয়ে না হয় আমি সরল মনে র’ব,
কেউ ঠকালে শেষে একটু হেসে সইব।
হিসাবি দুনিয়ায় সবাই তো ম ম,
লাভ-ক্ষতির হিসাবে মন হয় কম কম।
তার চেয়ে বোকা হয়ে ভালো থাকা ভালো,
যেখানে হৃদয়ে জ্বলে বিশ্বাসের আলো।
অবুঝের হাসিটুকু মনে আনে শান্তি,
মিথ্যে অহংকার সব পায় যেন ক্লান্তি।
চালাকের মার খেয়ে কেঁদে মরে যারা,
বোকাদের ভিড়ে আজ সুখী দেখি তারা।
শত আঘাতেও যদি সরলতা না মরে,
সেই বোকামি ভালো এই স্বার্থপর ঘরে।
কেউ যদি বলে আমায় অবুঝ ও বোকা,
মনে রেখো, সে তো নয় প্রতারণা ধোকা।
আমি তাই বোকা সেজে শান্তিতে বঁাচি,
স্বার্থের এই বাজারে সব ভালোবাসা যাচি।
ছবি-৩১
আবদুর নূর রাজ্জাক
মন্থনে অতিক্রান্ত দিনগুলো
তোমার এলোচুল
অধরের কম্পন
হাতের স্পর্শ
শরীরজুড়ে সুঘ্রাণ
বিভোর রজনী
আমার স্বপ্নের করিডোরে ছিল...
স্পর্শহীন অগলিত চুমো পড়েছিল
তোমার কপোলজুড়ে বেয়ে
পৃথিবীর কেউ কোনোদিন দেখেনি
তোলেনি অভিযোগ
শুধু তুমি আর আমি ছিলাম
ভাষাহীন আলাপন
তীক্ষ্ম তীব্র দৃষ্টিতে কেটেছে
মধুর যাতনা
সেই মন্থনের অতিক্রান্ত অনুভব
ফিরে আসে আমার হৃদয়ে
ফিরে আসে প্রচলিত দিনে,
গলিত অধ্যায়ে
যখন তুমি নেই
তখন আমি ভেবে ভেবে ব্যথা পাই।
***
নির্লিপ্ত দিনের গান
প্রাচীন বাসনা জেগে ওঠে মনে
আমাদের প্রেমের সেই দিনগুলো
আমরা ছিলাম সহস্র বছর
মাধবী রাতে
কত কথা বলেছি
চঁাদ আর তারার সাথে!
প্রেমের কথা, ফুলের কথা
নদী ও নারীর কথা
অনাগত মিলনের কথা।
তারপর পাখিরা এলো
তখনও নিঃশব্দ শিশির জাগেনি
আমরা অবিরাম কথা বলছি
সমুদ্রের কথা, নক্ষত্রের কথা।
কথা ফুরায় না,
গল্পের রাত ফুরায় না
ফুরায় শুধু এ জীবন!
যেমনি করে
ফুরিয়ে গেল ফুলের জীবন।
ছবি-৩১
মো. তানজিদ কোতয়াল
শিক্ষকের মহাআলোড়ন
অক্ষর শেখান কতজন, মানুষ গড়েন ক’জন?
জ্ঞান যেখানে দীপশিখা, বিবেক সেখানে মন।
শিক্ষক এসে মনের মাঝে সত্যের বীজ বোনেন,
অন্ধ সময়ের বুক চিরে আলোর পথ দেখান।
ভুলের মাঝে শাসন হয়ে, দুঃসময়ে স্নেহ,
পতনের পর উঠতে শেখানÑহার মানা নয় গেহ।
শেখানÑসত্য ক্ষীণ হলেও সত্যই শেষ জয়,
নীতিহীন প্রাপ্তির চেয়ে নীতির পথই শ্রেয়।
জ্ঞান শুধু জানার নয়, কাজে তার প্রকাশ,
মানুষের প্রতি মমতাতেই বিদ্যার পূর্ণ বিকাশ।
শেখানÑউঁচু শিখর ছুঁয়েও মাটির কথা মনে,
বিনয় যার অলঙ্কার, মহত্ত্ব থাকে তার সনে।
নিজের ক্লান্তি আড়াল করে স্বপ্ন গড়েন কত,
একটি প্রাণের জাগরণে বদলে দেন শত শত।
আজকের ক্ষুদ্র শিক্ষার্থী আগামী দিনের প্রাণ,
তার চরিত্রে বেঁচে থাকে শিক্ষকের অবদান।
একদিন পেরিয়ে যাবে শৈশব, ফুরাবে পাঠশালার দিন,
তবু জীবনের প্রতিটি বঁাকে বাজবে সেই আহ্বান।
শিক্ষকের সত্য বেঁচে থাকে শিষ্যের কর্মে-চরিত্রেÑ
মানুষ গড়ার মহৎ সাধনা অমর থাকবে পৃথিবীতে।
***
হে স্বাগতম শরৎকাল
শরৎ এলে আকাশজুড়ে নীলের দরজা খোলে,
সাদা মেঘের নৌকা ভাসে বাতাসেরই জলে।
কাশফুলেরা মাথা নাড়ে নদীর ধারের ঘাসে,
মনে হয়, শৈশব বুঝি ফিরে এসেছে পাশে।
শিউলি ঝরে ভোরের পথেÑসুগন্ধে ভরে প্রাণ,
দূর গঁায়ের মেঠোপথে জেগে ওঠে আজান।
ধানের ক্ষেতে রৌদ্র নামে সোনালি কোনো ছলে,
প্রকৃতি তার গোপন কথা শিশির দিয়ে বলে।
পাখির ডাকে সকাল ভাঙ্গে, নদী গায় প্রিয় গান,
বটের ছায়ায় বসে থাকে হারিয়ে যাওয়া প্রাণ।
কত স্মৃতি হাওয়ায় ভাসে, নাম না জানা সুরে,
কত আপন মুখ ফিরে আসে নীল আকাশের কোণে।
শরৎ যেন বলেÑ“মানুষ, একটু থেমে দঁাড়াও,
যা হারিয়েছ জীবনের পথে, তার হিসাবটা নাও।”
সময় তো আর নদীর মতো ফিরে আসে না কভু,
ঝরে যাওয়া শিউলি কি আর ফিরে পায় তার রঙটুকু?
তবু কেন এত ছুটে চলা, এত কিসের তাড়া?
জীবন তো এক শরৎ-সকালÑস্বল্প আলোয় ভরা।
শরৎ এলে আমি আকাশের দিকে তাকাই,
হারিয়ে যাওয়া মানুষটাকে নিজের মাঝে পাই।
যদি কোনোদিন শরৎ শেষে নেমে আসে শীত,
তবু নীলের স্মৃতি থাকুক হৃদয়জুড়ে নীত।
ছবি-৩১
সুমন সরকার
জন্মভূমি
আমার নাম নজরুল ইসলাম
হঁ্যা, এ নামেই বাবা-মা ডাকতো আমায়
জন্ম আমার বাংলায় এক নিবিড়
পল্লীর কোণে
বাংলা তখন কোন দেশ ছিলো না
বিশাল এক উপমহাদেশের এক টুকরো ছিল আমার জন্মভূমি বাংলা
আমার দেশের তখন কোন
রাষ্ট্র ধর্ম ছিলো না
বিশাল পরাধীন দেশের তেত্রিশ কোটির জনগণের মধ্যে
আমিও ছিলাম একজন।
জনগণের সমানসংখ্যক দেবতাও
আমার সেই কাঙ্গাল দেশে ছিলো।
এত দেবতাও যেমন দুঃখী মানুষের
দুঃখ না পারতো দূর করতে
আমিও তেমনি পারতাম না
তাই অগণিত নিরীহ আর
অকর্মণ্য দেবতার ন্যায় আমিও ছিলাম
হতভাগা দেশবাসীর কষ্টের গান গাইতাম।
ছবি-৩১
এম আর এম শোভন
নিরীহ পৃথিবী
নিরীহ পৃথিবী, অসহায় প্রকৃতি
কেন এই নিয়তির খেলা,
হে মানুষ তোমার কত প্রয়োজন
ধ্বংসের জন্য করেছো আয়োজন।
ধিক্কার জানাই মানুষ সভ্যতাকে
যারা হিংস্রাত্মক,
মনোভাবে নিয়ে ধ্বংস করেছো
পৃথিবী তার প্রকৃতির রহস্যকে।
মানুষের লোভ আর হিংসার হুঙ্কারে,
আজ ধুঁকে মরে লালিত এই পৃথিবী,
স্বার্থের টানে রক্তের প্লাবণে,
সবুজ পৃথিবী কেনো লাশে ভরা।
নিরীহ আলো আর শান্ত বাতাস,
কান্না চেপে রাখে শুধুই প্রশ্নের বাণীÑ
মানুষের এই ধ্বংসের উন্মাদনায়,
কোথায় লুকাবে নিষ্পাপ ধরণী?
ছবি-৩১
ইকরা
ক্ষতচিহ্ন
মানুষকে ভাঙাই আজ যুদ্ধ যেনো;
দেয় উন্মাদনা!
আঘাত করো, বিশ্বাস উড়াও;
স্বপ্নগুলো করো নিঃশেষণা,
অতঃপর ঠেঁাটের কোণে হাসি ফুটিয়ে;
জানতে চাও, ‘দুঃখিত হলাম কি না?’
কোথা আজ মুদ্রিত যেনো,
ক্ষমা মানেই, ‘ক্ষত মুছে যাওয়া?’
বলতে পারো কী?Ñ‘কত দামে কেনা যাবে,
হারিয়ে যাওয়া বিশ্বস্ততা?’
ধারের ক্ষত শুকায়, কিন্তু কথিত ব্যথা দাগ টেনে যায়!
কখনো কি ভেবেছিলে, ‘শব্দেরও যে ধার থাকে?’
সেই ধারের দংশনে মানুষও ছাই হতে পারে।
সব কথা রক্ত না ঝরালেও, করে দেয় নিঃস্ব।
তাইতো আমিও আজ আপনারই কাছেÑ
‘দুঃখিত!’
ছবি-৩১
ড. আব্দুস সাত্তার
প্রকৃতির রঙে
নদীর বুকে পাহাড়ের ছায়া, আকাশজুড়ে মেঘাবেশ,
প্রকৃতির এই নীরবতায় জাগে ভালোবাসার আবেশ।
দূর পাহাড়ের গায়ে যেন রোদ্দুর লেখে যায় প্রিয় গান,
নদীর ঢেউয়ে ভেসে আসে তোমারই প্রেমজ অভিমান।
নীল আকাশের মায়াবী চাদর জড়ায় বিস্তীর্ণ বনভূমি,
শিউলি ফুলের গন্ধে ভরে ওঠে শরতের নীরব ভূমি।
পাখির ডানায় ভোরের আলো ছুঁয়ে যায় দু’জনার মন,
বহতা নদীর কাছে বসে শুনি হৃদয়েরই গোপন অনুক্ষণ।
তুমি পাশে থাকলে স্রোতস্বিনী নদী হয়ে যায় এ প্রাণ
পাহাড় হয়ে আগলে রাখি তোমার সকল অভিমান।
আকাশজুড়ে যত তারা, সবই যেন প্রেমের ভাষাÑ
প্রকৃতির প্রতিটি রঙে তোমাকেই খুঁজি হে ভালোবাসা।
ছবি-৩১
মনির হোসেন খান
চিঠি
একটা চিঠি লিখা অসমাপ্ত রয়ে গেলো, কলমের কালি ফুরোয়নি
শুধু ইচ্ছেটা মরে গেছে।
একটা নীল খামে উড়ে আসা প্রেয়সির বিলাপ শোনা হলো না আর,
প্রতিক্ষার অন্ত জ্বালা ফুরিয়েছে
একরাশ ঘৃণার আবরণে ঢেকেছে মন
শক্ত মাটির গভীরে চাপা পড়েছে
যুগের অপেক্ষার।
তবুও মন কঁাদে তবুও আনমনে
চোখ পড়ে যায় মলিন ঐ চিঠির পাতাটায়।
একটা চিঠি লিখা আর শেষ হলো না অনন্ত অপেক্ষায়।
***
মানব
মানব হয়ে জন্মালে তুমি
মানুষ হতে পারলে কই
মানব তো সবাই হয়
মানুষ হয় কতোজনায়?
মানুষ বুঝি আজ বিলুপ্ত প্রাণী
দেখা কি মিলবে জাদুঘরে?
মানব তুমি বড্ড অবহেলা
মানুষ হওÑ লও সালাম সমাদরে।
মানবতা সভ্যতা আজ শিকেয় উঠেছে
জন্মেছে নিঠুরতা
বাতাস ভারি কষ্টের নিঃশ্বাস
ফুরোয়নি তবু মনুষত্বের ক্ষীণ আশা।
মানব হয়ে জন্মালে তুমি
মানুষ হতে পারলে কই
মানব আর মানুষের মাঝে
দেখবো ফারাক কতই।
ছবি-৩১
সেঁজুতি সাবরিন
ইতি প্রণয়
বহুদিন কাজল চোখে পরেনি তোমার চোখ,
প্রিয়ার সাথে শব্দ বোনা তোমার বুঝি বারণ?
অবহেলায়, অপেক্ষায় কবিতা আজ নির্বাক,
তোমার নিখেঁাজ চিঠি চলে যাওয়ার কারণ।
শব্দের বোঝা নিঃশব্দে বয়ে বেড়ায় মন,
শব্দকে নিঃশব্দ করতেই তোমার যত আয়োজন।
পড়লে মনে শেষে খুঁজো নাকো আমায়,
ভালোবাসি তবুও ইতি, প্রিয় প্রণয়।








