শনিবার, ০৩ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৭

অনুবাদ গল্প

মৃত নারীর রহস্য

মূল : গি দ্য মোপাসাঁ, ভাষান্তর : হাসানাত রাজিব

অনলাইন ডেস্ক
মৃত নারীর রহস্য

মহিলাটি মৃত্যুর সময় একটু যন্ত্রণাও ভোগ করেনি। একজন নিষ্কলঙ্ক জীবন কাটানো নারীর এমন মৃত্যুই প্রাপ্য। এখন তিনি নির্জীব শুয়ে আছেন তাঁর বিছানায়, চিত হয়ে। চোখ দুটি বন্ধ, মুখে অসীম প্রশান্তি, দীর্ঘ কাঁচা-পাকা চুলগুলো এমনভাবে গুছিয়ে রাখা ছিল, যেন মৃত্যুর ঠিক দশ মিনিট আগেও তিনি নিজের হাতে আঁচড়ে নিয়েছেন। মৃত মুখটিতে ফুটে আছে পরম আত্মসংযম, নীরবতা আর আত্মসমর্পণ। মুখটা দেখে যে কেউ অনুভব করতে পারত, কেমন এক নিষ্পাপ প্রাণ বাস করত এই শরীরে! এই বয়োবৃদ্ধ মানুষটি কতটা নিরব জীবন কাটিয়ে গেছেন, আর তার বিদায় কতটা সহজ ও পবিত্র ছিল!

বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে তাঁর দুই সন্তান—একজন ছেলে, যে কি না কঠোর নীতিবান একজন ম্যাজিস্ট্রেট; আর একজন মেয়ে—মার্গারিট, যাকে সবাই চেনে ‘সিস্টার ইউলালি’ নামে। ছোটবেলা থেকেই মা তাদের কঠোর নৈতিকতার বর্ম পরিয়ে বড় করেছেন; শিখিয়েছেন ধর্মের ব্যাপারে কখনো আপস না করতে আর নীতিতে অবিচল থাকতে। ছেলে হয়েছে বিচারক; কিন্তু আইনকে সে ব্যবহার করে দুর্বলদের নির্মমভাবে শাস্তি দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে। অন্যদিকে মেয়েটি, এই কঠোর রক্ষণশীল পরিবারে পুণ্যময় পরিবেশে বেড়ে ওঠার পর গির্জার সেবায় নিজেকে সঁপে দিয়েছে—হয়ে উঠেছে চার্চের বধূ। পুরুষজাতির প্রতি তার অনিঃশ্বেষ বিরাগ প্রকাশ পেত।

তারা তাদের বাবাকে বলতে গেলে চেনার সুযোগই পায়নি। তবে শুধু এটুকু জানত যে তিনি তাদের মায়ের জীবনটাকে বিষময় করে তুলেছিলেন। এর চেয়ে বেশি আর কিছুই তাদের জানানো হয়নি।

মার্গারিটা মৃত মায়ের হাত আঁকড়ে ধরে একের পর এক চুমু খাচ্ছিল। হাতটি মোমের মতো ফ্যাকাশে হয়ে আছে যেন বিছানায় পড়ে থাকা বড় ক্রুশটির মতোই শুভ্র। দেহের ওপর পাশে মায়ের অন্য হাতটি তখনও বিছানার চাদরটা এমনভাবে আঁকড়ে ধরে আছে, যেন মৃত্যুর আগের শেষ আকুতিটুকু ভাঁজ হয়ে চাদরের কাপড়ে স্মৃতির মতো আটকে গেছে। এবং এরপরই নেমে এসেছে চিরন্তন স্তব্ধতা।

হঠাৎ দরজায় কয়েকটি টোকা পড়ায় তারা কান্না বন্ধ করে মুখ তুলে তাকালো। নৈশভোজ শেষ করে মাত্রই ঘরে ফিরেছেন পাদ্রি। অসময়ে দ্রুত খাওয়া শেষ করায় হজমের গণ্ডগোলে মুখটা লাল হয়ে আছে, হাঁপাচ্ছেনও খানিকটা। বিগত কয়েক রাতের ক্লান্তি এবং মৃতের পাশে রাত জাগার ধকল সামলাতে কড়া এক কাপ কফি আর ব্র্যান্ডির মিশ্রণ এইমাত্রই গিলে এসেছেন।

পাদ্রির মুখে দুঃখের ছাপ, তবে এটা আসল নয়। এটা পেশাদারী কৃত্রিম শোক, যার বিনিময়ে তাঁর রুটি-রুজি জোটে। বুড়ো আঙুল দিয়ে বুকে ক্রুশচিহ্ন একে তিনি পেশাদার ভঙ্গিতে এগিয়ে এলেন, “আহা, আমার বাছারা! দুঃখের এই শেষ সময়গুলোতে তোমাদের পাশে একটু বসার জন্যই এলাম।”

কিন্তু সিস্টার ইউলালি হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং বললেন, “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, ফাদার। তবে আমার ভাই আর আমি মায়ের পাশে একান্তে কিছুক্ষণ থাকতে চাই। মাকে শেষবারের মতো দেখার এটাই তো আমাদের শেষ সুযোগ। আমরা তিনজন একান্তে কাটাতে চাই—যেমনটা আমরা ছোটবেলায় কাটাতাম, যখন আমাদের দুঃখিনী মা...”

শোকের তীব্রতায় তাঁর কণ্ঠ থেমে এলো, চোখের জলে কথা আর এগোলো না।

পাদ্রি আবার স্বাভাবিক হয়ে এলেন। মনে মনে নিজের নরম বিছানার শুয়ে থাকার সুযোগ পাওয়ার কথা ভেবে তিনি বিনীতভাবে মাথা নোয়ালেন, ‘বেশ, তোমরা যেমন চাও, আমার বাছারা’। হাঁটু গেড়ে বসে বুকে ক্রস এঁকে প্রার্থনা শেষ করে তিনি নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলেন। মনে মনে বলে গেলেন, ‘আহা, কী পুণ্যবতী নারী ছিলেন তিনি!’

ঘরে রয়ে গেল শুধু সেই মৃত নারী আর তাঁর দুই সন্তান। কোণে ছায়ায় ঢাকা ঘড়িটির টিকটিক শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। খোলা জানালা দিয়ে ভেসে আসছে শুকনো ঘাস আর বনের মিষ্টি সুবাস, সাথে স্নিগ্ধ জোছনার আলো। চারপাশে আর কোনো শব্দ নেই-মাঝে মাঝে শুধু দু-একটি ব্যাঙের ডাক আর রাতের পোকার ঝিঁঝিঁ আওয়াজ। এক অসীম প্রশান্তি, ঐশ্বরিক বিষাদ আর নীরব নিস্তব্ধতা যেন ছেয়ে ফেলেছিল সেই মৃত নারীকে। আর তাঁর ভেতর থেকে আসা সেই আবহ শান্ত করে তুলছিল যেন পুরো প্রকৃতিকেই।

তারপর বিচারক ছেলেটি হাঁটু গেড়ে বসে বিছানার চাদরে মুখ গুঁজে কান্নায় ভেঙে পড়ল। চাদর আর তোষকের নিচে চাপা পড়া গলায় ডুকরে উঠল, ‘আম্মা, আম্মা, ও আম্মা!’ আর তার বোন, শক্ত কাঠের ফ্রেমে উন্মাদদের মতো বারবার কপাল ঠুকতে ঠুকতে যেন মৃগী রোগীর মতো কাঁপতে লাগল। আকুল হয়ে বিলাপ করে উঠল, “প্রভু গো! হে যীশু, আম্মা! হে যীশু!” আকস্মিক এই বেদনার ঝড়ে দুজনই ধুঁকতে লাগল, নিঃশ্বাস আটকে আসতে লাগল তাদের।

ধীরে ধীরে সেই কান্নার বেগ কমে এলো। সমুদ্রে যেমন ঝড়ের পর হঠাৎ নিথর নিস্তব্ধতা নেমে আসে, তেমনি তারা নিভৃতে কাঁদতে লাগল।

বেশ খানিকটা সময় কেটে গেল। তারা উঠে দাঁড়িয়ে মায়ের নিথরদেহের দিকে তাকাল। সেই সব দূর অতীতের স্মৃতিগুলো একে একে মনে পরছিল—যা গতকালও ছিল ভীষণ জীবন্ত, আর আজ তা কালান্তক যন্ত্রণা হয়ে বিঁধছে। ছোট ছোট সেই সব গোপন আর চেনা মুহূর্তগুলো, যা চট করে ফিরিয়ে আনে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষকে। তারা একে অপরকে মনে করিয়ে দিতে লাগল মায়ের সেসব দিনগুলোর কথা, তাঁর কথা বলার ভঙ্গি, হাসি, আর গলার সুর-যে মা আর কখনো তাদের সাথে কথা বলবেন না! মনে পড়ল মায়ের বলা ছোট ছোট কথাগুলো; বিশেষ কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা জোর দিয়ে বলার সময় তাদের মা খুব মিষ্টি ভঙ্গিতে হাতের তাল মেলাতেন।

আজ তারা মাকে এমনভাবে ভালোবাসতে লাগলো, যেমনটা অতীতে আর কখনো বাসেনি। নিজেদের বেদনার গভীরতা মাপতে গিয়ে তারা বুঝতে পারল, কতখানি নিঃসঙ্গ হতে চলেছে তাদের ভবিষ্যৎ!

যে মা ছিলেন তাদের সব কাজের আশ্রয়, সঠিক পথের দিশারি, পুরো শৈশব-কৈশোর আর জীবনের সবটুকু সেরা অংশ-সেই মা'ই আজ হারিয়ে গেলেন। অতীত আর পূর্বপুরুষদের সাথে তাদের যে রক্ত ও স্নেহের বাঁধন ছিল, সেই মা আজ আর নেই। তারা এখন পুরোপুরি একা, নিঃসঙ্গ দুটো প্রাণী-যাদের পেছনের দিকে তাকানোর আর কোনো সুযোগ নেই।

মার্গারিটা তার ভাইকে বলল, “তোমার মনে আছে, ভাই, আম্মা কীভাবে তাঁর পুরোনো চিঠিগুলো বারবার বের করে পড়তেন? ওই যে, ড্রয়ারটার ভেতরেই তো সব রাখা আছে! চলো না, আজ রাতে মায়ের পাশে বসে আমরা সেই চিঠিগুলো পড়ি; চিঠিগুলোর মধ্য দিয়ে মায়ের পুরো জীবনটাকে আর একবার নতুন করে স্মরণ করি! আমাদের দাদু-দিদিমার জীবনের সাথে তো আমাদের পরিচয়ই হয়নি, যদিও আম্মা প্রায়ই তাঁদের কথা বলতেন। চিঠিগুলো পড়ে তাঁদেরকে চেনা যেন এক পবিত্র পুণ্যযাত্রার মতো হবে, তাই না বলো?”

ড্রয়ার খুলতেই বেরিয়ে এলো হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ দিয়ে বাঁধা বেশ কয়েকটি ছোট ছোট তোড়া। পরম যত্নে সুতো দিয়ে বেঁধে একটার পাশে আরেকটা সাজিয়ে রাখা। স্মৃতিচিহ্নগুলোকে তারা বিছানার ওপর ছড়িয়ে দিল এবং সেখান থেকে ‘বাবা’ লেখা একটি তোড়া বেছে নিল। ফিতে খুলে চিঠিগুলো পড়তে শুরু করল তারা।

সেগুলো ছিল পুরোনো আমলের সেই ধাঁচের চিঠি, যা সাধারণত প্রাচীন ধুলোজমা ডেস্কের ড্রয়ারে মেলে-যেসব চিঠির ভাঁজে ভাঁজে যেন অন্য শতকের গন্ধ লেগে থাকে। প্রথম চিঠিটি শুরু হয়েছিল, “আমার প্রিয়তমা...”, আরেকটি, “আমার রূপসী বালিকা...”, কোনোটিতে লেখা, “আমার সোনা বাচ্চা...”, আবার কোনোটিতে “আমার লক্ষ¥ীটি...” লেখা।

হঠাৎ করেই মার্গারিটা উচ্চস্বরে চিঠিগুলো পড়তে শুরু করলেন। মৃত মায়ের সামনে বসেই যেন তাঁর জীবনের পুরো ইতিহাস, পরম আদরের সব স্মৃতিগুলোকে আবার বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিচারক ভাইটি বিছানায় কনুই ভর দিয়ে মায়ের মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুনতে লাগল। সেই নিশ্চল মৃতদেহটিকে দেখে মনে হচ্ছিল, যেন সে পরম শান্তিতে ভেসে যাচ্ছে।

হঠাৎ করেই পড়া থামিয়ে সিস্টার ইউলালি বললেন, এই চিঠিগুলো মায়ের সাথেই কবরে দিয়ে দেওয়া উচিত। এগুলো দিয়ে মায়ের দাফনের কাপড় বানিয়ে তাঁকে কবর দেওয়া উচিত।

এই বলে তিনি অন্য আরেকটি তোড়া হাতে নিলেন, যাতে কারো নাম লেখা ছিল না। শক্ত গলায় তিনি পড়তে শুরু করলেন:

“আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয়, আমি তোমাকে মরণপণ ভালোবাসি। গতকাল থেকে তোমার স্মৃতির আগুনে পুড়ে আমি নারকীয় যন্ত্রণা সহ্য করছি। আমার ঠোঁটে যেন এখনও তোমার ঠোঁটের স্পর্শ, আমার চোখে চোখ, আমার বুকে বুক...। আমি তোমাকে ভালোবাসি, বড্ড বেশি ভালোবাসি! তুমি আমাকে পাগল করে দিয়েছ। আমার শূন্য হাত দুটো তোমাকে আকড়ে ধরার ব্যাকুলতায় বাড়িয়ে দিচ্ছি, বুকটা হাঁপাচ্ছে তোমাকে আবার বুকে জড়ানোর আদিম কামনায়। আমার পুরো আত্মা আর শরীর তোমার জন্য চিৎকার করছে, শুধু তোমাকেই চাইছে। আমার মুখে এখনও লেগে আছে তোমার সেই নিবিড় চুমুর স্বাদ-”

বিচারক ভাই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। বোন পড়া থামিয়ে দিল। হাত থেকে ঝাটকা মেরে চিঠিটা কেড়ে নিয়ে সে নিচে সই খোঁজার চেষ্টা করল। সেখানে কোনো নাম ছিল না, শুধু লেখা ছিল: “তোমাকে যে পূজো করে, সেই লোক”-আর নিচে লেখা “হেনরি”।

তাদের বাবার নাম ছিল ‘রেনে’। তার মানে, এই চিঠি তাদের বাবার লেখা নয়!

ছেলেটি দ্রুত অন্য চিঠিগুলোর তোড়া ওলটপালট করে আরেকটি চিঠি বের করে পড়তে লাগল: “তোমার আদর ছাড়া আমি আর এক মুহূর্তও বাঁচতে পারছি না...”

সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, এজলাসে বিচারকের আসনে বসার মতোই কঠোর মুখে সে সেই মৃত মায়ের দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাল। দেবীপ্রতিমার মতো নিস্পৃহ দাঁড়িয়ে থাকা বোনটি চোখের কোণে জল ধরে রেখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল-পরবর্তী পরিস্থিতির অপেক্ষায়।

ছেলেটি ধীরে ধীরে হেঁটে ঘরের কোণে গেল এবং জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরের অন্ধকার রাতের দিকে তাকিয়ে রইল।

সে যখন আবার ঘুরে দাঁড়াল, বোন সিস্টার ইউলালি তখনও চোখের পানি মুছে মাথা নিচু করে বিছানার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটি সামনে এগিয়ে এলো। এক ঝটকায় সব চিঠিগুলো তুলে নিয়ে ড্রয়ারের ভেতর এলোমেলো করে ছুড়ে ফেলে দিল। তারপর টেনে বন্ধ করে দিল বিছানার পর্দা।

ভোরের আলো ফুটে উঠতেই যখন টেবিলের মোমবাতিগুলোর আলো ফ্যাকাশে হয়ে এলো, ছেলেটি ধীরে ধীরে তার চেয়ার ছেড়ে উঠল। যে মায়ের ওপর সে মনে মনে কঠোর রায় দিয়ে ফেলেছে এবং যে মা সন্তান আর মায়ের পবিত্র সম্পর্কটাকে চুরমার করে দিয়েছেন-তাঁর দিকে শেষবারের মতো আর না তাকিয়ে সে নিচু গলায় বলল :

“চলো বোন, এখন আমাদের যাওয়া উচিত।”

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়