প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৫
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
২৯. রইদালি রে রইদালি
কই গেলি রে কই গেলি?
অর্থ ও ব্যাখ্যা : এটা একটা ঋতুভিত্তিক শ্লোক। শীতকালের সকালে গ্রামে পুকুরপাড়ে বসে গরম কাপড় গায়ে দিয়ে ছোট-বড় সবাই রোদ পোহাতে বসে। তখন সূর্যকে ডেকে ডেকে বলে, ও রোদওয়ালি (রইদালি), কই গেলে?
৩০. মোচ অলা খাই গিয়ে
দাড়ি অলা বাঝি গিয়ে।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : এ শ্লোক দেশজুড়ে প্রচলিত। চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষায় গোঁফকে বলে মোচ। মোচওয়ালা চুরি করা খাবার খেয়ে নামমাত্র অংশ দাড়িওয়ালাকে দিয়ে যায়। সেই অল্প খাবার খেতে গিয়েই দাড়িওয়ালার দাড়িতে খাবারের অংশবিশেষ লেগে থাকে। ফলে সে সহজেই শনাক্ত হয়ে যায় এবং আটক হয়। এর তাৎপর্য হলো, আমাদের সমাজে প্রকৃত অপরাধী আইনের ফাঁক গলে বেঁচে যায় আর তুলনামূলক নিরপরাধী দণ্ডিত হয়।
৩১. নুন খাই যার
গুণ গাই তার।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : এটা একটা কৃতজ্ঞতা প্রকাশমূলক শ্লোক। যে উপকার করে লোকে তার প্রশংসা করে; যে আহার দেয় উপকারভোগী তারই জয়গান গায়।
৩২. যম জামাই ভাগিনা
তিনজনা নয় আপনা
অর্থ ও ব্যাখ্যা : এটা সামাজিক টানাপোড়েনের একটা শ্লোক। এ শ্লোকমতে, এ জগতে তিন ধরনের লোককে সন্তুষ্ট করা কঠিন। যথা : যম—যে মৃত্যুর পরোয়ানা আনে, তাকে সন্তুষ্ট করে কখনও নির্ধারিত জীবনকালের চেয়ে আয়ু বাড়ানো যায় না; আরেকজন হলো মেয়ের জামাই—আদর-আপ্যায়ন শত করলেও তার সন্তুষ্টি পাওয়া কঠিন; তৃতীয়জন হলো ভাগিনা—মামাবাড়িতে মামী যতই আদর করুক না কেন, বাড়ি ফিরে সে মামাবাড়ির বদনাম করবেই। এ তিনজন কখনও আপন হয় না।
৩৩. ঊনা ভাতে দুনা বল
বেশি ভাতে রসাতল।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : বলা হয়, ভাত কখনও পেটপুরে খেতে নেই; কিছুটা কম খেয়ে উঠতে হয়, এতে কাজ করার শক্তি পাওয়া যায়। এ শ্লোকেও তা বলা হচ্ছে। ঊনাভাতে (কম খেয়ে) দুনা (দ্বিগুণ) বল লাভ করা যায়; আর ভরপেট ভাত খেলে নড়াচড়া করা যায় না, একজায়গায় বসে থাকতে হয়। পরবর্তীতে মেদ তাকে গ্রাস করে এবং শরীর স্থূল হয়ে তাকে কর্মে অক্ষম করে তোলে।
৩৪. পেটেন অষুধ খাইয়া
পেটেন বল লইয়া।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : চরণদ্বীপ বৌদ্ধপল্লির পুবপাড়ায় একজন আয়ুর্বেদিক ওষুধ বানাতেন। তিনি কয়েকটা ওষুধের পেটেন্টও করেছিলেন। তাঁদের বাড়ির ছেলেপেলেকে ক্ষ্যাপাতে অন্যরা শ্লোক বানিয়ে বলে যার অর্থ : পেটেন্ট ওষুধ তোরা খাস, তাই তোরা পেটেন্ট বলও (শক্তি) পাস।
৩৫. যে ন বুঝে মনে মনে
তারে বুঝাইত পারিবু কঅনে?
অর্থ ও ব্যাখ্যা : যে কিছুতেই বুঝতে চায় না তাকে বোঝানো যায় না। বুঝদার ব্যক্তিকে সহজে বোঝানো যায়; কিন্তু যে না বোঝার গোঁ ধরে বসে থাকে, তা হাজার চেষ্টাতেও বোঝানো সম্ভব নয়।
৩৬. লওউতলে বিয়াইয়ে গাই
হেই ঘরর মঅত ভাই।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : অনেক সময় মানুষ ক্ষমতাবানের সাথে নিজের সম্পর্ক জাহির করতে দূরের আত্মীয়তাকেও বড় করে তোলে। কোনো গায়ের লাউ গাছের নিচে গাভী বাছুর প্রসব করেছে বলেই সে সুবাদে ওই গাঁয়ের মানুষকে আত্মীয় ভাবা সুবিধাবাদী মানুষের কাজ। নিজের স্বার্থ হাসিলে কিছু মানুষ এমন ঘোরানো-প্যাঁচানো আত্মীয়তাও আবিষ্কার করে ধন্য হয়।
৩৭. উইথ অই পড়ি পরাণ যার
হতীনে কদ্দে হালুক খার।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : পুকুরঘাটে স্নান করতে গিয়ে এক সতীন উপুড় হয়ে (উইথ অই) পড়ে মরে আছে, তবু অন্য সতীন দেখে মনে করে আসলে উপুড় হয়ে সে শালুক খাচ্ছে। এ শ্লোক দিয়ে গ্রামীণ পরিবেশে সতীনের রেষারেষিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
৩৮. তোরে মাইল্লে তুইও মার
ন ফাইরলি ফাত্থর মার।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : শ্লোকটি দ্বারা ঝগড়া-বিবাদে পিছিয়ে না আসার জন্য উৎসাহিত করা হয়। কাউকে মারলে সেও যেন মারে, শুধু মার যেন না খায়। হাতে মারতে না পারলে যেন দূর থেকে পাথর হলেও মারে; তবু মার খেয়ে আসা যাবে না।
৩৯. ধরা পইড়লি মশকারি
ধরা ন পইড়লি চুরি।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : উপরোক্ত বয়ানে মানুষের হীন অভ্যাসকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কেউ কেউ আছেন যারা চুরির তালে জিনিস সরায়; ধরা পড়লে তাকে ঠাট্টা বলে পার পেতে চায়।
৪০. বল বল
বাহুবল।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : নিজের শক্তিই শক্তি; অন্যের শক্তিতে বলীয়ান হওয়া বোকামি। নিজের শক্তিতে আস্থা রাখাটাই মুখ্য।
৪১. গরবা আইসসি
হরবা দি চাবি ধর।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : গ্রামে ঘরে ঘরে অতিথি (গরবা) এলে আনন্দের ধুম পড়ে যায়। অতিথি যাতে তাড়াতাড়ি না যায়, কয়েকদিন থাকে, তাই বুড়োবুড়ি বলে : গরবারে হরবা দি (মাটির পাতিলের ঢাকনা দিয়ে) চাবি (চেপে) ধরো।
৪২. খাইয়্যুম গোস্ত মাইজ্জুম ফাল
অর্থ ও ব্যাখ্যা : গ্রামে ভালোমন্দ সবসময় রান্না হয় না। বিশেষত মাংসের পদ আগেকার দিনে নিত্য রান্না হতো না। কোনো নেমন্তন্ন হলে তখন রান্না হতো বেশি। তাই দাওয়াত পেলে কিশোর-কিশোরীরা খুশিতে বলে, ‘খাইয়্যুম গোশত মাইজ্জুম (মারব) ফাল।’
৪৩. টঁঅলে বাছা টঁঅলে
ধান খাইয়েদে কঁঅলে।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : এটা বাচ্চাকে ঘুমপাড়ানোর লোকছড়া। এতে বলা হচ্ছে, দোল খা (টঁঅলে) বাছা দোল খা, ঘুঘুতে (কঁঅলে) ধান খেয়ে যায়। অর্থাৎ বাচ্চাকে দোল দিতে দিতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে বলা হচ্ছে কারণ ঐ দিকে উঠোনে শুকোতে দেওয়া ধান ঘুঘু এসে খেয়ে যাচ্ছে, মাকে ঘুঘু তাড়াতে যেতে হবে।
৪৪. জাদুমণি কই?
পইড়তো গিয়ে গই
সোনার কলম বানাই দিয়ুম
লেখি আইও গই।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : এটা একটা ঘুমপাড়ানির লোকছড়া। বাচ্চাকে জাদুমণি বলে উল্লেখ করে বলা হচ্ছে, সে কই গেছে? সে পড়তে গেছে। তাকে সোনার কলম বানিয়ে দেওয়া হবে, সে যেন লেখাও শিখে আসে।
৪৫. ডাক ডা কিস্ কো
আমকো বাড়ি তোমকো
চীন লইবা না জাপান লইবা?
জাপান জাপান।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : এটা হলো গ্রামীণ খেলায় শুরুতে দুই দলে ভাগ হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়। ভালো খেলোয়াড়-খারাপ খেলোয়াড় কোনোরূপ পক্ষপাত ছাড়া অংশগ্রহণকারী কিশোর-কিশোরীরা দুই দলে ভাগ হতে গিয়ে জোড়ায় জোড়ায় আড়ালে নিজেদের বিভিন্ন নাম দিয়ে দুই নেতার কাছে আসে। তারপর বলে :
‘ডাক ডা কিস্ কো
আমকো বাড়ি তোমকো
চীন লইবা না জাপান লইবা?
জাপান জাপান।’
মানে হলো, কাকে ডাকবা ডাকো; চীন নিবে নাকি জাপান নিবে। তখন যার ডাক সে নেতা যদি বলে ‘জাপান জাপান’, তার মানে দাঁড়ায় জাপান নাম দেওয়া খেলোয়াড়কে সে তার দলে ডেকেছে।
৪৬. গুইল্লা লড়ে পেঁয়াপো বাজে
পেঁয়াপো বাজে পেঁয়াপো বাজে।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : দুষ্ট কিশোর-কিশোরীদের দল একে অন্যকে ক্ষ্যাপাতে এ শ্লোক ব্যবহার করে। পেঁয়াপো শব্দের অর্থ হলো বাঁশি।
৪৭. যাক যাক যাক আঁরো ঘরত যাক
টেঁয়া-পইসা ধন-সম্বত্তি বেয়াক আঁরও ঘরত যাক।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : এটা চৈত্রসংক্রান্তি পরবের ‘জাগ দেওয়া’ পর্বের একটি শ্লোক। চৈত্র মাসের শেষের আগের দিন সন্ধ্যায় বাড়ির উঠানে ‘জাগ’ দেওয়া হয়। ‘জাগ’ দেওয়া হয় বন-জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করা শুকনা বা আধা শুকনা লতাপাতা জড়ো করে তাতে আগুন ধরিয়ে। এ সময় উৎপন্ন ধোঁয়াকে হাতে ঠেলে বাড়ির খোলা দরজার দিকে পাঠিয়ে শ্লোক আউড়ে আকাঙ্ক্ষা করা হয় :
‘যাক যাক যাক আঁরো ঘরত যাক
টেঁয়া-পইসা ধন-সম্বত্তি বেয়াক আঁরও ঘরত যাক।’
অর্থাৎ টাকা-পয়সা (টেঁয়া-পইসা), ধন-সম্পদ (সম্বত্তি) সব যেন আমাদের (আঁরো) ঘরে যায়।
৪৮. চি আর বাই
চি খেলা খাই
চি আর গরমে হাডু ডু বোলাই
হাডু ডু বোলাই...
অর্থ ও ব্যাখ্যা : এটা ‘চি’ খেলা নামের একটি গ্রামীণ খেলার বোল। এক নিশ্বাসে এটা আওড়ানো হয়। নিশ্বাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত ‘হাডু ডু বোলাই’ বলতে হয়।
৪৯. কিচ্ছা মিচ্ছা
নাইরকলর চুচ্চা
অর্থ ও ব্যাখ্যা : আগেকার দিনে চরণদ্বীপ বৌদ্ধপল্লিতে নাতি-নাতনিদের আবদারে ঠাকুরমা-দিদিমারা কিচ্ছা বলতেন। গ্রামে রূপকথার গল্প এবং লোককথাকে কিচ্ছা বলে। এই বহুশ্রুত কিচ্ছাকে নিয়েই কিশোর-কিশোরীদের দল ছড়া কাটে:
‘কিচ্ছা মিচ্ছা / নাইরকলর চুচ্চা।’
অর্থাৎ কিচ্ছাগুলো মিছে, নারকেলের চুচ্চার (ছাড়ানো খোসার শুকনো তন্তু) মতো।
৫০. এরেত বেরেত লোআর কেরেত
সাম সুম ডবলা ভুরুত।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : যে বাতকর্ম করে সে চেপে যায়, কিন্তু তার গন্ধ সবার নাকে যায়। শিশু-কিশোরদের মধ্যে কেউ বাতকর্ম করে চেপে গেলে তাকে শনাক্ত করতে এ শ্লোক কাটে গ্রামের শিশুরা। শ্লোক যার কাছে গিয়ে শেষ হয় ধরে নেওয়া হয়, সে-ই বাতকর্মের হোতা। অর্থাৎ ‘ভুরুত’ যার কাছে পড়ে সে-ই উদ্দিষ্ট ব্যক্তি। (লোআর = লোহার)।
৫১. যে লামে হাঁডু পানি
তার লাই এক গলা নামি।
অর্থ ও ব্যাখ্যা : যে আমার বিপদে একটু এগিয়ে আসে, আমি তার বিপদে অনেকটুকু এগিয়ে যাই। এটা উপকারীর উপকার স্বীকার করে প্রতিদানে তার পাশে থাকার অঙ্গীকারবিশেষ।
উল্লেখিত শ্লোকে বলা হলো, যে বন্যা হতে ত্রাণে আমার জন্য এক হাঁটু (হাঁডু) সমান পানিতে নামবে, আমি তার জন্য (তার লাই) এক গলা সমান পানিতে নামব। (চলবে)








