সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৫

সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার

ছায়াশিকারি

মিজানুর রহমান রানা
ছায়াশিকারি

দশ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

নিঃশব্দের শহর আর নিঃশব্দ থাকে না। ইমতিয়াজ ও অনন্যার আবিষ্কার ছড়িয়ে পড়ে শহরের দেয়াল পেরিয়ে, আর শব্দহীন হৃদয়গুলোতে জ্বলে ওঠে ভাষার আগুন। সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা বিপ্লবীরা, যারা এতদিন ছায়ার মতো বেঁচে ছিল, তারা একে একে জেগে ওঠে। কেউ ছিল শিক্ষক, কেউ কবি, কেউ ট্রেনচালক, কেউবা শুধু একজন মা; কিন্তু সবার হৃদয়ে ছিল একটিই ভাষা, যা উচ্চারিত হয়নি, তবু কখনো হারায়নি।

ইমতিয়াজ ও অনন্যা তাদের কাছে পাঠায় হৃদয়-ভাষায় লেখা বার্তা—একটি নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে তারা সবাই মিলিত হবে এক গোপন স্থানে, যেখানে শব্দ নিষিদ্ধ, কিন্তু স্পন্দন বৈধ।

একটি পরিত্যক্ত লাইব্রেরি; যেখানে বই নেই, শুধু ধুলো আর নীরবতা। সেখানেই জড়ো হয় শত শত মানুষ। তারা কেউ কথা বলে না, তারা শুধু চোখে চোখ রাখে, হাত রাখে বুকে, আর হৃদয়ের ছন্দে পাঠ করে এক নতুন মন্ত্র: ‘ভাষা মানে শুধু শব্দ নয়, ভাষা মানে অস্তিত্ব। আমরা হারাইনি, আমরা অপেক্ষা করেছি। এখন সময় ভাষাকে ফিরিয়ে আনার।’

তারা শহরের দেয়ালে দেয়ালে অদৃশ্য ভাষায় বার্তা লিখে দেয়, যা সেন্সর বুঝতে পারে না, কিন্তু মানুষ অনুভব করে। তারা শব্দ-পুলিশের যন্ত্রে বিকৃতি ঘটায়, যাতে হৃদয়-ভাষা ধরা না পড়ে। তারা পুরোনো কবিতার লাইন, ছেঁড়া গান, হারিয়ে যাওয়া নাম—সব ফিরিয়ে আনে। শহরের শিশুরা প্রথম উচ্চারণ করে সেই শব্দ, যা বহু বছর নিষিদ্ধ ছিলো : “মা”।

নাহার, আরাধ, ইরফান, বৃষ্টি, ইমতিয়াজ, অনন্যা—তারা সবাই ছায়া থেকে আলোয় আসে। তারা জানে, এই বিপ্লব শুধু ভাষার নয়; এটি দীর্ঘদিনের স্মৃতি, পরিচয় ও ভালোবাসার পুনর্জন্ম। হাজারো বিপদের মধ্যে এগোতে এগোতে আজ দেড়শ বছর পার হয়েছে, কিন্তু মানুষ এখনো কথা বলার অধিকার পায়নি। মানুষ নিরাপদে চলার, বলার স্বাধীনতা পায়নি। তারপর ধীরে ধীরে অনেক যুগ পার হয়েছে, শতাব্দীর জন্ম হয়েছে। হাজারো আবু সাঈদ, মুগ্ধ নিঃশেষ হয়েছে, কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে এদের দলনেতারা সব ভুলে গেছে। তারাই আবার নতুন স্বৈরাচার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

ইরফান তার হৃদয়ের কম্পন আঁকে আর প্রশ্ন করে, ‘কে তাদের সঙ্গীদের খুনগুলো করছে?’

সেই কম্পন নাহার, আরাধ, বৃষ্টি, ইমতিয়াজ, অনন্যাসহ সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এখন আর ইরফানকে খাতায় লিখতে হয় না, এখন আর অন্যদের কথা বলে বোঝাতে হয় না। শুধু মস্তিষ্কে কিছু ভাবলেই হয়, আর সেই ভাবনা অন্যদের অন্তর বেয়ে মস্তিষ্কের নিউরনে পৌঁছে যায়। তারা একে অপরের মৌনবাণী বুঝতে পারে।

শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘ধ্বনি চত্বর’। যেখানে একসময় কবিতা পাঠ হতো, গান গাওয়া হতো, সেখানে এখন শুধু এক বিশাল স্ক্রিন ঝুলে থাকে, যা দিনে-রাতে প্রচার করে নিয়ন্ত্রকগোষ্ঠীর আদেশ। কিন্তু আজ সেই স্ক্রিন হঠাৎ নিভে যায়। মানুষ থমকে দাঁড়ায়। শব্দ-পুলিশের চোখে সন্দেহের ছায়া। কেউ জানে না, কী হতে যাচ্ছে।

ঠিক তখনই চত্বরে উঠে দাঁড়ায় একজন নারী। তার মুখে কোনো মাইক নেই, কণ্ঠে কোনো শব্দ নেই, তবু তার চোখে আগুন।

নাহার। সে বুকের ওপর হাত রাখে, চোখ বন্ধ করে। তার হৃদয়ের কম্পন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে, একটি অদৃশ্য তরঙ্গের মতো। তারপর চোখ মেলে তাকায়, আর ঠোঁট না নেড়েই উচ্চারণ করে, ‘আমি আছি। আমি বলব। আমি থামব না। আমি সাথীদের মৃত্যুর বদলা নেবই নেব। কাউকে ক্ষমা করব না।’

তার চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো একে একে হাত রাখে বুকে। তারা কেউ কিছু বলে না, তবু তাদের হৃদয় একসঙ্গে ধ্বনিত হয়— “আমি আছি। আমি বলব। আমি থামব না।”

শব্দ-পুলিশ এগিয়ে আসে। তাদের যন্ত্র কিছুই ধরতে পারে না; কারণ এখানে শব্দ নেই, আছে স্পন্দনের প্রতিরোধ।

নিয়ন্ত্রকগোষ্ঠী আতঙ্কিত। তারা জানে, এই ভাষা তারা বুঝতে পারে না, এই ভাষা সেন্সর করে থামানো যায় না। তারা ঘোষণা দেয়, “হৃদয়-ভাষা রাষ্ট্রদ্রোহ। যে অনুভব করবে, সে অপরাধী।”

কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। শহরের প্রতিটি দেয়ালে, প্রতিটি ট্রামের গায়ে, প্রতিটি শিশুর চোখে লেখা হয়ে গেছে, “ভাষা মানে শুধু শব্দ নয়, ভাষা মানে অস্তিত্ব।”

ক্রমে ক্রমে ঘর থেকে ছোট শিশু-কিশোর-তরুণ ও যুবকেরা বের হয়ে আসতে থাকে। এগোতে থাকে প্রধান দপ্তরের দিকে, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর বসবাস। পুলিশ ও গোয়েন্দাবাহিনী খবর পাঠায় নিয়ন্ত্রকগোষ্ঠীর হেডকোয়ার্টারে; সেখানে মিলিত হয় সমস্ত শক্তি। তারা ঐক্যবদ্ধ হয়—সবাইকে গুলি করে মেরে হলেও নিজেদের ক্ষমতা রক্ষা করতে হবে। তারা নির্দেশ পাঠায় : সবাইকে মেরে ফেলো, কাউকে জীবন্ত রাখবে না।

শব্দ-পুলিশের অফিসার নির্দেশনা দেয়, ‘গুলি করো ওদের!’ শুরু হয় গুলির মাতম। শহরের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ বিপ্লবীদের গুলি করতে থাকে। ক্রমে ক্রমে লাশের স্তূপ জমে ওঠে। এক থেকে দেড় হাজার বিপ্লবীর রক্তে ভেসে যায় রাস্তার পিচ।

পুলিশের গুলি নিঃশেষ হয়ে যায়, কিন্তু ওরা শেষ হয় না। পতঙ্গের মতো যত মরে, তার চেয়ে আরও বেশি হাজির হয় পুলিশের গুলির সামনে। হাজার হাজার কিশোর-যুবক-যুবতী একের পর এক বুকের জমিনে রক্তের বন্যা নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে থাকে। এ সময় কোথা থেকে রুহান নামের ৩০ বছর বয়সী এক যুবক এগিয়ে আসে। সে বিপ্লবীদের রক্ত নিজ শরীরে মাখে, মাথায় পতাকা বাঁধে। তারপর স্লোগান তোলে, ‘হয় মারো, না হয় মরো! এগিয়ে যাও সামনে, ধ্বংস করো যা পাও শত্রুদের!’

ক্রমে ক্রমে তারা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের দিকে হাজির হতে থাকে। এ সময় সবার সামনে ইরফানকে দেখা গেল। তার হাতে জাতীয় পতাকা। বৃষ্টি, অনন্যা, ইমতিয়াজ, নাহার, আরাধ—সবাই ইরফানের পেছনে।

এ সময়ই বজ্রপাতের ন্যায় চিরকালের বোবা ইরফানের মুখ থেকে বেরিয়ে এল আগুনের গোলা। সে মুখে বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করল, ‘সামনে চলো, আর তোমরা সবাই সরব হও। স্লোগান ধরো—আমরা আর বোবা হয়ে থাকব না, হয় মরব না হয় জিতব। আজকে আর ঘরে ফেরা হবে না বিজয়ের মালা হাতে না আসা পর্যন্ত!’

ইরফানের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা শব্দবোমায় সবাই যেন প্রাণ ফিরে পায়। যে ইরফান কোনোদিন কথা বলেনি, আজ সেই ইরফানের মুখে বজ্রপাতের ন্যায় কথা বেরিয়ে আসছে!

হঠাৎ করেই ইরফানের পাশে দেখা গেল সাংবাদিক তুষার, তার বান্ধবী লায়লা ও প্রকৌশলী রাশেদকে; যারা শুরুতেই নির্যাতনসেলে কাটিয়েছে বহু বছর। অবাক হয়ে ওরা তাকিয়ে থাকে; জাতি দীর্ঘ ১৬টি বছর নির্বাক থেকে আজ তাদের মুখ খুলে গেছে, তারা এখন কথা বলছে আর সামনে নির্ভয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

বৃষ্টি, তাসফিয়া, নাহার, অনন্যা, ইমতিয়াজও ইরফানের কণ্ঠস্বরে চমকে গেল। এই কি ইরফান? যে এতদিন তাদের সাথেই থেকেছে কিন্তু কথা বলতে শেখেনি, কথা বলেনি; আজ তার মুখে হুংকার!

এ সময় প্রতিটা মানুষের কণ্ঠ থেকে আগুন বেরোয়। তারাও স্লোগান ধরে আর রাজপ্রাসাদের দিকে এগোতে থাকে।

প্রধানমন্ত্রী তার প্রাসাদে ডাকলেন তিন বাহিনীপ্রধানদের। তারপর তাদেরকে ধমকে উঠে উচ্চস্বরে বললেন, ‘তোমরা কি আমাদের নুন খাওনি? তাহলে এখন তোমাদের বাহিনী কী করছে? গুণ গাওয়ার সময় তো তোমরা নষ্ট করে ফেলেছ! ওই সন্ত্রাসীরা আমার বাসভবনের দিকে এগিয়ে আসছে পঙ্গপালের মতো!’

‘গতকাল আমরা সব ব্যবস্থাই করে রেখেছিলাম, ডিবির হারুন সাহেবও তার বাহিনী নিয়ে ওদের প্রায় কয়েকশ লোককে মেরেছে। কিন্তু তারা গুলির সামনে বুক পেতে দিতে ভয় পায় না। আমি বাঙালিদের চিনতে পারছি না, এরা কারা? এই বাঙালির এত সাহস কোত্থেকে এল?’ উত্তর দিলেন দেশরক্ষা বাহিনীর চাবুক সিং।

প্রধানমন্ত্রী উত্তেজিত। ডাকলেন আবাল সিংকে। আবাল সিং ও সুবোধ মিশ্র নতমস্তকে এসে হাজির।

প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘তোমরা আমাদের প্রধান নীতিনির্ধারক ছিলে। তোমাদেরকে আমরা অনেক ক্ষমতা দিয়েছিলাম—আইন-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে সবকিছু তোমরাই নিয়ন্ত্রণ করতে। তাহলে এখন তোমরা এই বিপদ থেকে আমাদেরকে কীভাবে রক্ষা করবে?’

‘এখন আর ভাবার অবকাশ নেই। আপনাকে তো সেভ করতে হবে। তাই এই পঙ্গপালের দলের সহিংসতা থেকে রক্ষা পেতে হলে আপনাকে উড়াল দিতে হবে আকাশে।’

‘ওহ, তুমিও তাহলে স্বার্থপর! এতদিন তাহলে তোমরা কী করছিলে? জনগণকে বোবা ভেবে শুধু টাকাপয়সা হাতিয়ে সুইস ব্যাংকে জমা রাখছিলে?’ প্রধানমন্ত্রী চরম ক্ষিপ্ত হয়ে কথাগুলো বললেন।

‘আর বেশি সময় নেই,’ তাড়া দিল দেশরক্ষা বাহিনীর প্রধান চাবুক সিং, ‘আপনাকে ৪৫ মিনিটের মধ্যেই দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে।’

‘আমি যাব না, আমি এই দেশেই মরব,’ বায়না ধরলেন প্রধানমন্ত্রী।

‘আপনাকে তো ওরা মেরে ফেলবে!’ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে আবাল সিং তাড়া দিল।

তারপর, সময় থেমে থাকে না। শহরের আকাশে গুলির ধোঁয়া, মানুষের রক্ত, আর প্রতিধ্বনির মতো ছড়িয়ে পড়ে একটাই বাক্য, ‘আমরা আর বোবা হয়ে থাকব না। সবাই কথা বলতে চাই—নির্ভয়ে।’

প্রধানমন্ত্রী শেষবারের মতো জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকান। দেখেন হাজারো মানুষ। রক্তাক্ত, ক্লান্ত, তবু অদম্য। তাদের চোখে ভয় নেই, কণ্ঠে আগুন। তিনি বুঝে যান, ক্ষমতা আর তার হাতে নেই। তিনি পেছনে তাকান—আবাল সিং, সুবোধ মিশ্র, চাবুক সিং—তিনজনেই নীরব, কেউ আর কোনো নির্দেশ দেয় না।

একটি হেলিকপ্টার প্রস্তুত থাকে ছাদে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হঠাৎ বলেন, ‘আমি যাব না। আমি এই দেশের মাটি, এই দেশের রক্তে গড়া। যদি মরতেই হয়, তবে এই মাটিতেই মরব।’ তার কণ্ঠে প্রথমবারের মতো ভয় নয়, বরং এক ধরনের পরাজয়ের স্বীকারোক্তি।

চত্বরে ইরফান পতাকা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার কণ্ঠে আগুন, কিন্তু চোখে জল। সে বলে না কিছু, শুধু পতাকাটি মাটিতে পুঁতে দেয়। তারপর বলে, ‘এই পতাকা আজ শুধু রাষ্ট্রের নয়, এটি ভাষার, অনুভবের এবং মানুষের।’

শহরের প্রতিটি কোণে আগুন জ্বলে ওঠে, কিন্তু তা ধ্বংসের নয়, জাগরণের। পুরোনো স্ক্রিনগুলোতে ভেসে ওঠে শিশুদের মুখ, তারা উচ্চারণ করে, ‘মা, ভাষা, ভালোবাসা।’

পরিত্যক্ত লাইব্রেরিতে ধুলো ঝেড়ে বইগুলো আবার সাজানো হচ্ছে। প্রথম বইটি খুলে দেখা যায়, ভেতরে লেখা : ‘এই ইতিহাস রক্তে লেখা, এই ইতিহাস নিঃশব্দতার বিরুদ্ধে উচ্চারণ।’

হাজার হাজার মানুষের সামনে আরাধ, বৃষ্টি, ইমতিয়াজ, অনন্যা, নাহার, তুষার আহমেদ, তাসফিয়া, প্রকৌশলী রাশেদ, লায়লা আর রুহান। তারা সবাই দাঁড়িয়ে আছেন শহরের কেন্দ্রস্থলে। তাদের চারপাশে নতুন প্রজন্ম, যারা আর ভয় পায় না।

ইরফান ধীরে বলে, ‘আমরা জিতিনি, আমরা জেগে উঠেছি। এখন থেকে ইতিহাস আমরা লিখব—শব্দ দিয়ে নয়, অনুভব দিয়ে।’ (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়