প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৪
চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলাম : সাক্ষাৎকার
শিল্প কখনো শেষ হয় না, শিল্পী সবসময় অতৃপ্ত

বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম প্রধান শিল্পী মনিরুল ইসলাম। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি স্পেনে বসবাস করলেও তাঁর শিল্পের গভীরে রয়েছে বাংলাদেশের নদী, প্রকৃতি, স্মৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি চাঁদপুরে তাঁর নিজ বাসভবনে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপের সুযোগ হয়। শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প, জয়নুল আবেদিনের স্মৃতি, স্পেনে যাত্রা, শিল্পদর্শন, নারী শিল্পীদের অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে এই কথোপকথনে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন লেখক ও গবেষক মুহাম্মদ ফরিদ হাসান।
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : চাঁদপুরের মানুষের সঙ্গে চাঁদপুরে বসে কথা বলতে পারাটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের। আপনাকে শুভেচ্ছা জানাই।
মনিরুল ইসলাম : আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। আমি চাঁদপুরে ভালো বোধ করছি।
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : শুরুতেই আপনার শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে শৈশব বা কৈশোরের কোনো ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাই, যা আপনাকে শিল্পী হয়ে উঠতে সহায়তা করেছে?
মনিরুল ইসলাম : এখন আমার বয়স তিরাশি হতে চললো। তার মানে প্রায় পঁচাত্তর বছর আগেকার কথা। কালচারালি হোক বা জিওগ্রাফিক্যালি হোক—তখনকার বাংলাদেশ আর এখনকার বাংলাদেশের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। ঠিক কবে ভেবেছি শিল্পী হবো— স্মৃতি হাতড়ে এটি বলা মুশকিল। শিল্পী হওয়ার জন্য কোনো সচেতন সিদ্ধান্ত ছিলো না। তবে ভেতরে একটা সহজাত বোধ ও আবেগতাড়িত তাড়না ছিলো, যা আমাকে হাতের কাজ করার দিকে ঠেলে দিতো।
আমি তো ইউরোপীয় কালচারে জন্ম নিইনি। ইউরোপে শুরু থেকেই মিউজিয়াম, থিয়েটার ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম থাকে। যেমন স্পেনে একটা শহরেই চল্লিশটা থিয়েটার আর সিনেমা হল এবং ৩০টার বেশি ক্লাসিক্যাল গ্যালারি-মিউজিয়াম রয়েছে। আমাদের এখানে ৩০ বছর আগে একটা মহকুমা শহরে এসবের কিছুই ছিলো না। আর্ট বলতে ছিলো সাইনবোর্ড, সিনেমার বড় বড় ব্যানার, রিকশার পেইন্টিং, কাচের ওপর উল্টো করে লেখা লেটারিং আর সেলুনের কাচের লেখা। এছাড়া ছিলো মেলার লোকশিল্প, মাটির পুতুল, ইলিশ মাছের প্রতিকৃতি। এসব দেখে আনন্দ পেতাম। এই ছোটখাটো জিনিসগুলো এখনও নস্টালজিক স্মৃতিতে কোথাও কোথাও জাগ্রত আছে; যদিও বেশিরভাগই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুছে গেছে।
আমার ছোটবেলায় কোনো পেইন্টিং বা মিউজিয়াম দেখার সুযোগ ছিলো না। তবে স্কুলে আমার হেডমাস্টার স্যার জগদীশ রায় ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী, পরিপাটি ও পরিচ্ছন্ন মানুষ। তিনিই বোধহয় প্রথম বলেছিলেন যে, আমি একজন শিল্পী। স্কুলে একটা দেয়ালপত্রিকা ছিলো। সেখানে আমি হেডিং লিখতাম, অলংকরণ করতাম। মাসখানেক ধরে সেই দেয়ালপত্রিকা বোর্ডে টাঙানো থাকতো। সিনিয়র-জুনিয়র সব ছাত্র এসে দেখতো। বিশেষ করে কার্টুনগুলো দেখে ওরা খুব আনন্দ পেতো। তখন দূর থেকে দেখে গর্ব অনুভব করতাম যে, আমার কাজটাকে সবাই অ্যাপ্রিশিয়েট করছে।
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : চাঁদপুর বা কিশোরগঞ্জের পরিবেশ-প্রকৃতি কি আপনার চিত্রকলাকে প্রভাবিত করেছে?
মনিরুল ইসলাম : অবশ্যই করেছে। আমি বেড়ে উঠেছি কিশোরগঞ্জে, সেখানে ছিলাম বাইশ বছর। সেখানে পেয়েছি নরসুন্দা নদীর সান্নিধ্য। অন্যদিকে চাঁদপুরে আমার পৈতৃক নিবাস, মেঘনার দুরন্তপনা দেখেছি। নদীর একটা বিরাট প্রভাব থাকে মানুষের ওপর। যারা সমুদ্রের কাছাকাছি বড় হয়, তারা বিশ্রামের জন্য বারবার সৈকতে ফিরে যায়; যারা পাহাড়ে জন্মায়, তারা পাহাড়েই ফিরে যায়। এটা একধরনের ম্যাগনেটিক, প্রায় স্পিরিচুয়াল টান। মানুষ যেখানে জন্ম নেয়, সেই জায়গার একটা আকর্ষণী শক্তি থেকে যায়, সে যতো দূরেই থাকুক না কেন।
আমরা তাই বলি, আমি যখন স্পেনে চলে গেলাম, প্রথম কয়েক মাস খুব খারাপ লাগতো। বাড়ির কথা, পরিবারের কথা মনে পড়তো। কিন্তু ৫০ বছরের বেশি হয়ে গেলো, এখনও দেশের বাড়িঘরের প্রতি সেই মায়া-মমতা রয়ে গেছে। বেঁচে থাকার তাগিদে দেশের স্মৃতি আস্তে আস্তে দূর হতে থাকে। অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যাওয়া ছাত্র হোক বা দুবাইয়ে শ্রম দিতে যাওয়া বাঙালি শ্রমিক, সবার ক্ষেত্রেই এটা সত্যি।
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : আপনি স্পেন কীভাবে গেলেন?
মনিরুল ইসলাম : আমার নিজের বিদেশে যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিলো না। পাকিস্তান আমলে বিদেশে যাওয়া প্রায় অসম্ভব, একরকম মিরাকল ছিলো। পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যটা এমন ছিলো যে, ঘাসটা এই জায়গায় জন্মাতো, গরুও এখানে চরতো, কিন্তু দুধটা নিয়ে যেতো ইসলামাবাদে। আমরা যখন প্রবেশ করতাম, বলা হতো ‘মুসলিম ভাই ভাই’। আমরা চুপ করে মেনে নিতাম। কিন্তু একটা সময় এলো, যখন সেই ‘ভাই ভাই’ শব্দটাই আর ব্যবহার হতো না।
আমার এক বন্ধু ছিলেন নুরুল ইসলাম, তিনি পিএইচডির জন্য চেষ্টা করছিলেন। আমি তখন সদ্য শিক্ষকতা শুরু করেছি। মানুষের জীবনে অনেক সময় এমন একটা মুহূর্ত আসে, যখন এক সেকেন্ডের মধ্যে জীবন ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যেতে পারে। আমার ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছিলো। আমি কোনোদিন ভাবিনি যে দেশের বাইরে যাবো, যাওয়ার কোনো অপশনও ছিলো না।
১৯৬৯ সাল। দেশ রাজনৈতিকভাবে উত্তাল, টালমাটাল। আমার সহকর্মী ছিলেন রফিকুন নবী। একদিন আর্ট কলেজের সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় তিনি বললেন, স্পেনে যাওয়ার একটা ফর্ম আছে, পূরণ করতে চাই কি না। তখন কেউ কেউ ১৫ বছর ধরে এই ফর্ম পূরণ করে যাচ্ছেন, কিন্তু কোনো উত্তর পাননি। তবু আমি আধা-অনিচ্ছায় কিছু কাগজপত্র জমা দিলাম। ভাবলাম বিদেশে গেলে প্র্যাকটিসের কাজে লাগবে। তারপর ভুলেই গিয়েছিলাম। তিন-চার মাস পর হঠাৎ একটা টেলিগ্রাম এলো। টেলিগ্রাম বরাবরই একটা ভয়ংকর জিনিস, দুঃসংবাদ ছাড়া সুসংবাদ আনত না। কিন্তু এবার লেখা ছিলো, অবিলম্বে স্পেনে রওনা দিতে হবে। একদিকে বিস্ময়, এটা তো প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার; অন্যদিকে হতাশা, যাবো কীভাবে? আমার বেতন ছিলো ২০০ টাকা, স্পেনে যাওয়ার যাতায়াত ভাড়া লাগবে ৪,০০০ টাকা। তখনকার হিসেবে সেটা এখনকার প্রায় চার লাখ টাকার সমান।
স্কলারশিপটা ছিলো স্পেন আর পাকিস্তানের মধ্যে একটা কালচারাল এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের অংশ। একজন স্প্যানিশ পাকিস্তানে আসবে, একজন পাকিস্তানি স্পেনে যাবে। এর জন্যে কোনো মেধার প্রয়োজন ছিলো না, এটা ছিলো একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : আপনি যে রাজনৈতিক টালমাটাল সময়ের কথা বললেন, সেই সময়টা কি আপনার চিত্রচর্চাকে প্রভাবিত করেছে?
মনিরুল ইসলাম : অবশ্যই। রাজনৈতিক উত্তাল সময়ে আমি প্রভাবিত হই। স্পেনেও আমি যুদ্ধ নিয়ে ছবি এঁকেছি— একটা গোটা সিরিজ, সাদা-কালোয়। এতে ফ্রান্সিসকো গোয়ার (ঋৎধহপরংপড় এড়ুধ) প্রভাব স্পষ্ট। গোয়া তখনকার বিখ্যাত চিত্রকর, এখনও তাঁকে ধরা হয় মাস্টারদের একজন। তিনশো-চারশো বছর আগের ক্লাসিক্যাল শিল্পী, যাঁর ছবিতে মিউজিয়াম ভরে আছে। তাঁর একটা বিখ্যাত সিরিজ আছে, ‘ডিজাস্টার্স অব ওয়ার’— যুদ্ধ আর মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে করা। অপূর্ব সব ছবি, তবে সেগুলো ড্রয়িংরুমে টাঙানোর মতো সুখকর ছবি নয়। শিল্পের ভেতরে টেনশন ও উৎকণ্ঠা নিয়েও আঁকা হয়, সেগুলো বোঝা যায় প্রাসঙ্গিকতা দিয়ে।
আমার বন্ধু শাহাবুদ্দিন, প্যারিসপ্রবাসী শিল্পী, সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধ শেষ হয়ে ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ছবি আঁকেন। এই সৃজনপ্রক্রিয়াটা এরকমই। কবি শামসুর রাহমানও যুদ্ধ নিয়ে লিখতেন। আমার নিজেরও শামসুর রাহমানের সঙ্গে একটা প্রজেক্টের পরিকল্পনা ছিলো, তিনি মারা যাওয়ায় তা আর হয়নি।
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : আপনার নিজের আঁকা সবচেয়ে প্রিয় কয়েকটা ছবির নাম কী?
মনিরুল ইসলাম : ছবি আঁকার পরপরই সেটি প্রিয় থাকে, তারপর আস্তে আস্তে অপ্রিয় হয়ে যায়। এটাই স্বাভাবিক, নয়তো আমি আর কাজ করতে পারতাম না। যদি নিজের সেরা সৃষ্টি করে ফেলেছি ভেবে সন্তুষ্ট হয়ে যেতাম, তাহলে সৃজনপ্রক্রিয়াটাই থেমে যেতো। এই যে একটা অতৃপ্তি, নতুন কিছু না হওয়ার বোধ— এটাই পরের ছবির জন্ম দেয়। শিল্প কখনো শেষ হয় না, শিল্পীরা সবসময় অতৃপ্ত।
এক কথায় বলতে গেলে, ছবি হলো সময়কে ধরে রাখা। যে মুহূর্তে কাজ করছি, সেই সময়টাকে ধরে রাখার চেষ্টা। এটা ঠিক ইমপ্রেশনিজম নয়, বরং এটা সব শিল্পক্ষেত্রেই সত্য। আমার এক বন্ধু বলতেন, জীবনের সবকিছুই আর্ট, নথিপত্র ছাড়া বাকি সবকিছুই শিল্প। কেউ সুন্দর করে কথা বললে তা শুনতে ইচ্ছা করে, কেউ আক্রমণাত্মক কথা বললে সেখান থেকে উঠে যেতে ইচ্ছা করে। পোশাক পরার আর্ট আছে, হাঁটার আর্ট আছে, রান্নার আর্ট আছে— সবকিছুই।
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : আপনাদের সময়ে আর্ট কলেজের অবস্থা কেমন ছিলো?
মনিরুল ইসলাম : আমরা যখন আর্ট কলেজে পড়তাম, তখন হাতে গোণা কয়েকটা বই ছাড়া কোনো রেফারেন্স ছিলো না। গোয়া, রেমব্রান্ট, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, ভিঞ্চি—এই চারটে ভালো বই ছাপা ছিলো। আমাদের আর্ট কলেজটা তৈরি হয়েছিলো ফোর্ড ফাউন্ডেশনের টাকায়। জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানের মতো শিল্পীরা কলকাতা থেকে এসে সেগুনবাগিচায় একটা আর্ট স্কুল শুরু করেছিলেন, যা থেকে আস্তে আস্তে গড়ে ওঠে আজকের সুন্দর আর্ট কলেজ ভবন। পৃথিবীতে এতো সুপরিকল্পিত একটা প্রতিষ্ঠান খুব কমই আছে। এর স্থপতি ছিলেন মাজহারুল ইসলাম, যাঁর নিজস্ব একটা স্বাক্ষর ছিলো স্থাপত্যে। তাঁর করা প্রতিটি ভবন দেখলেই বোঝা যেতো এটা তাঁর কাজ। স্থাপত্যের জগতে তিনি একরকম গুরু, মাস্টার অব অল আর্কিটেক্টস। রফিক আজম, পলাশ, খালিদ আশরাফসহ বহু স্থপতি তাঁর ছাত্র, কেউ কেউ আগা খান অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন।
আমাদের সময় বিমূর্ত ছবি সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণাই ছিল না। আমিনুল ইসলাম, মূর্তজা বশীর তখন ইমেজভিত্তিক কাজ করতেন— স্টিল লাইফ, বোতল, গাছ, দৃশ্যপট এসব। তখনও রুচি সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তবে আমরা বলতাম জয়নুল আবেদিনের ড্রয়িং সবচেয়ে শক্তিশালী। এরপর এলেন মোহাম্মদ কিবরিয়া, একজন গ্রেট পেইন্টার। আসলে ছবি বোঝার বিষয় নয়— তুমিও বোঝ না, আমিও বুঝি না। এমনকি নিজের ছবিও নিজে বোঝার জিনিস না। এটা অনুধাবন করার, অনুভব করার বিষয়— একরকম অস্পর্শনীয় ব্যাপার। তবে দৃশ্যপট, নৌকা, গরু বা মানুষ নিয়ে আঁকা দৃশ্যমান ছবি বোঝা যায় সহজেই, সেখানে ভালো-মন্দ বিচার করা তুলনামূলক সহজ।
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : আপনি একবার জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে চাঁদপুরে এসেছিলেন। সেই গল্পটা যদি একটু বলতেন।
মনিরুল ইসলাম : হ্যাঁ, আমরা একদিন এসেছিলাম। জয়নুল আবেদিন স্যার আর্ট কলেজে নিয়মিত চাকরি করতেন না। মাঝেমধ্যে আসতেন, ঘোরাফেরা করতেন, প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন নিয়ে ভাবতেন। আমি কলেজে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার পর তিনি একদিন জিজ্ঞেস করলেন, আমি কী করতে চাই। আমার সামনে তখন দুটো পথ ছিলো—একটা পারিবারিক আর্ট ট্রেনিং প্রতিষ্ঠানে ৬০০ টাকা বেতনে যোগ দেওয়া, অথবা টেলিভিশনে চাকরি নেওয়া, যেখানে অনেক শিল্পী তখন যোগ দিচ্ছিলেন। আর আর্ট কলেজে থাকলে বেতন ছিলো মাত্র ২০০ টাকা, তিন ভাগের এক ভাগ। জয়নুল আবেদিন স্যার পরামর্শ দিলেন, যদি সত্যিই ছবি আঁকতে চাও, তাহলে আর্ট কলেজেই থেকে যাও। নয়তো অন্য পথ বেছে নিতে পারো, জীবনটা তোমার নিজের পছন্দ।
পরে তিনি নিজেই আমাকে চাঁদপুরে নিয়ে এলেন একটা কমিশন করা ছবি আঁকতে। আমরা তাঁর বাসায় প্রায়ই আড্ডা দিতে যেতাম। তিনি জানতেন আমার কাছে রং-কাগজের স্টক থাকে। একদিন সন্ধ্যায় তাঁর পিয়ন এসে খবর দিলো, রাতেই দেখা করতে হবে। স্যারের কাছে গিয়ে জানলাম, চাঁদপুর যেতে হবে। বেঙ্গল রিভার ট্রান্সপোর্টের একটা স্টিমারে চড়ে আমরা চাঁদপুরে রওনা দিলাম। ব্রিটিশ আমলের দুটো জাহাজ ছিলো, একটার নাম ‘গাজী’, আরেকটা অন্য নামে পরিচিত। বিশাল সব মেশিনারিজ, পিস্টনের শব্দ—অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা! নদীপথেই আমরা চাঁদপুরে পৌঁছালাম।
চাঁদপুরে তখন আইডব্লিউটিএ-র (অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ) একটা গেস্টহাউস ছিলো নদীর পাশে, নতুন বাজার এলাকায়—সেখানেই আমরা উঠেছিলাম। পরদিন সকালে দশ টাকা দিয়ে সারাদিনের জন্য একটা নৌকা ভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম রং-তুলি নিয়ে। তিনি প্রচুর ধূমপান করতেন, একের পর এক সিগারেট টানছিলেন আর ছবির বিষয় খুঁজছিলেন। ছবির বিষয়বস্তুর একটা নির্দিষ্ট শর্ত ছিলো, তাতে থাকতে হবে একটা রকেট স্টিমারের চিমনি, হলুদ-কালো ধোঁয়া উড়িয়ে চলা। কারণ এটা ছিলো একটা কমিশন করা কাজ, নির্দিষ্ট বিষয়েই আঁকতে হবে।
প্রথম দিন কিছুই হলো না। তিনি চিন্তিত মুখে বললেন, আজ হবে না। আমি নিজেও উত্তেজিত ছিলাম দেখার জন্য যে তিনি কীভাবে ছবি আঁকেন। সন্ধ্যায় ফিরে এলাম, লোকজন এসে গল্পগুজব করলো। পরদিন আবার একই নৌকায়, একই জায়গায় গিয়ে ছবির বিষয়বস্তু ঠিক হলো। তিনি একটা ছবি আঁকলেন, আমিও পাশে বসে একই বিষয়ে একটা ছবি আঁকলাম।
মেঘনা নদী আমাকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছে—তার যে বিশালতা, যার কোনো প্রান্ত চোখে দেখা যায় না। এই বিরাট শূন্যতার একটা অনুভূতি নিয়ে মানুষ বিকেলে নদীর ধারে যায়, যদিও সেখানে দেখার মতো কিছুই নেই, কোনো দিগন্তরেখাও নেই, নদী শুধু নীরবে চেয়ে থাকে। এই বিরাট, একঘেয়ে শূন্য পরিসরটা মানুষের একসময় প্রয়োজন হয়ে পড়ে, বিশেষত যারা মানসিকভাবে ক্লান্ত। আমাদের আগেকার জীবনযাত্রা ছিলো অনুভূমিক—ছোট ছোট বাড়ি, খোলা প্রাঙ্গণ। এখন আমরা উলম্ব জীবনযাপনে চলে এসেছি, আর এই পরিবর্তন শুধু জীবনযাত্রাই নয়, মানসিকতাও বদলে দিয়েছে। আমার ছবিতে তাই অনেক বেশি সাদা, ফাঁকা পরিসর দেখা যায়—অনেকটা মাগ্রিতের ছবির মতো, ভেতরে ঢুকলে যেন কিছুই নেই, শুধু একটা পরিসর, নিজের অভ্যন্তরে থাকার একটা অনুভূতি।
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : বাংলাদেশে যে নারী চিত্রশিল্পীরা কাজ করেন, তাঁরা কি বিশেষ কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন?
মনিরুল ইসলাম : এখন বাংলাদেশে ভালো ভালো নারী শিল্পী উঠে আসছেন, এটা দেখে আমি আশাবাদী। তাঁরা একটা গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন। আমাদের সমাজ মূলত পুরুষতান্ত্রিক, স্প্যানিশ সমাজের মতোই। পুরুষ ষাঁড়ের সঙ্গে লড়াই করে নিজেকে পুরুষালি প্রমাণ করে, আর নারী রান্নাঘরে থাকে। রান্নাঘরে ঢুকলে অনেক পুরুষ বলে ওঠে, ‘তুমি যাও, এটা আমার কাজ নয়’। এমনকি একটা ডিম ভাজতেও অস্বস্তি বোধ করে— ‘নিজে কেন করবো’ এই মানসিকতা।
আমি নিজে অনেক বছর ধরে স্পেনে নিজের বাড়িতে অতিথি আপ্যায়ন করেছি। প্রফেসর ইউনূস থেকে শুরু করে আবেদ সাহেব (ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা), চলচ্চিত্র অভিনেত্রী, রাজনীতিবিদ— অনেকেই আমার বাড়িতে থেকেছেন একাধিকবার। আমার বাড়িটা স্পেনের সবচেয়ে দামি এলাকার একটায়, ‘কাসা দে আমেরিকা’ প্রাসাদের কাছেই। এত মানুষকে আপ্যায়ন করেছি, কারণ রান্না করাটা আমি ভালোবাসি। আমি নিজে ডিভোর্সড, বহু বছর ধরে একা থাকি, তাই নিজে রান্না করা শিখে নিয়েছি। এখন কেউ আমার স্টুডিওতে কাজ করার সময় দাঁড়িয়ে দেখুক বা মন্তব্য করুক—তা পছন্দ করি না।
নারী শিল্পীদের প্রতিবন্ধকতার কথায় ফিরি। আগে মূলত সচ্ছল পরিবারের মেয়েরাই আর্ট কলেজে পড়তে আসতেন, গাড়িতে চড়ে আসতেন। আমরা যারা মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র পরিবার থেকে আসতাম, আমরা ছিলাম দ্বিতীয় শ্রেণির মতো। মেয়েরা বেশিরভাগই শখের বশে আর্ট কলেজে পড়তে আসতেন। কখনো কখনো এই শখ অন্যরকম রূপও নিতো। তবে সাধারণত এটাকে সৌন্দর্যের একটা বিষয় হিসেবে দেখা হতো, যা বিয়ের ক্ষেত্রে সুবিধা করে দিতো।
এখন পরিস্থিতি ভিন্ন, কিন্তু নতুন ধরনের প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়। বছর আটেক আগে একটা মেয়ে দুবার আমার কাছে এসেছিলো, পরে জানতে পারি তার আঙুল কেটে দিয়েছিলো তার স্বামী। কারণ, ছবি এঁকে তো লাভ নেই, ছবি বিক্রি হয় না, আঁকার দরকারই নেই। বাংলাদেশে অনেক স্বামীই শিল্পী স্ত্রীকে পছন্দ করেন না। কারণ আমাদের সংস্কৃতিতে নারীর শালীনতা ও পর্দা রক্ষার একটা অলিখিত অনুশাসন রয়ে গেছে, যা শিল্পচর্চার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করা হয়।
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : আপনার প্রিয় শিল্পী কারা?
মনিরুল ইসলাম : আমি নিজেকে খুব বড় শিল্পী মনে করি না। আমি বলবো, আমি চাঁদপুরের একজন অধিবাসী, যে ছবি আঁকে। শিল্পী হওয়া সহজ—আর্ট কলেজের একটা টাইটেল নিলেই শিল্পী, কিন্তু ছবি আঁকা কঠিন। শিল্পীর কাজের মধ্যে যেসব উপাদান থাকা দরকার, সেগুলো নিয়ে ভাবলে দেখা যায়, একজন শিল্পীর নিজস্ব একটা ব্যক্তিত্ব থাকতে হয়। তিনশো শিল্পীর কথা মনে করলে দেখা যায় বেশিরভাগই একই ধরনের কাজ করেন। নিজের একটা আলাদা জগৎ তৈরি করাটাই কঠিন কাজ। এটা গল্পের বইয়ের মতো নয়, যেখানে শব্দ-বাক্য দিয়ে বোঝা যায় কোনটা ভালো বই, কোনটা খারাপ। একই ভাষায় লেখা হলেও প্রতিটি শিল্পী নিজস্ব জগৎ নিয়ে কাজ করেন—একজন ফুল নিয়ে, আরেকজন দৃশ্যপট নিয়ে, আরেকজন পটচিত্র নিয়ে, কেউবা মিনিমালিজম নিয়ে। কে কার চেয়ে ভালো, তা বলা অসম্ভব।
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : আপনার একটা ছবি সর্বোচ্চ কত দামে বিক্রি হয়েছে?
মনিরুল ইসলাম : বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ২৮ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে একটা ছবি। ইউরোপে এখন এতো দামে ছবি বিক্রি করা কঠিন, কারণ ইউরোপের অর্থনীতি সংকটে। আমেরিকান বা সৌদি ক্রেতা নজরে না পড়লে এতো দাম পাওয়া মুশকিল। একসময় ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, হল্যান্ড এসব দেশ ছিলো শিল্পবাজারের কেন্দ্র, এখন আর তা নেই; বাজারটা এখন পুরোপুরি বিশ্বায়িত হয়ে গেছে।
উল্লেখ্য, শিল্পী মনিরুল ইসলাম চাঁদপুর পৌর এলাকার গুণরাজদী গ্রামের সাতানি পাটোয়ারী বাড়ির সন্তান। তিনি এ বাড়ির মরহুম ইউছুফ আলী পাটোয়ারীর পুত্র এবং চাঁদপুর শহরের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ঢাকা কনফেকশনারীর মালিক মরহুম মো. দিলওয়ার হোসেইনের সহোদর।
শিল্পী মনিরুল ইসলাম ১৯৯৭ সালে স্পেনের রাষ্ট্রীয় পদক পান। ২০১০ সালে তিনি ভূষিত হন স্পেনের মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা দ্য ক্রস অব দি অফিসার অব দি অর্ডার অব কুইন ইসাবেলায়। স্পেনের রাজা সপ্তম ফার্দিনান্দ রাণী ইসাবেলার সম্মানে ১৮১৫ সালের ১৮ মার্চ রয়্যাল অ্যান্ড আমেরিকান অর্ডার অব ইসাবেলা দ্য ক্যাথলিক নামের এই পদক প্রবর্তন করেন। পরে ১৮৪৭ সালে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় রয়্যাল অর্ডার অব ইসাবেলা ক্যাথলিক। ১৯৯৮ সালে পদকটির বর্তমান নামকরণ হয়। (সূত্র : উইকিপিডিয়া)
শিল্পী মনিরুল ইসলাম আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি বাংলাদেশে ১৯৯৯ সালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’, শিল্পকলা একাডেমি পদকসহ বিভিন্ন পদক ও সম্মাননা পান। চাঁদপুরকে ব্যক্তিগত কীর্তিতে যাঁরা গৌরবময় করেছেন, শিল্পী মনিরুল ইসলাম নিঃসন্দেহে তাঁদের মধ্যে অনন্য।







